প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফরের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি : ৩৬ ঘণ্টায় চার খুন

# মহানগরীতে দুটি ও রূপসায় দুটি মরদেহ উদ্ধার, মাথায় গুলির চিহ্ন
# একের পর এক হত্যাকা-ে আতঙ্কিত নগরবাসী #
স্টাফ রিপোর্টার ঃ প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফরের আগেই অবনতির দিকে যাচ্ছে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা মহানগরী ও রূপসায় চারটি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মহানগরীতে দুটি এবং রূপসায় দুটি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রূপসায় উদ্ধার হওয়া দুজনেরই মাথায় ছিল গুলির চিহ্ন। একের পর এক হত্যাকা-ে যেন লাশের মিছিলে ভাসছে খুলনা। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
আগামী ৫ নভেম্বর খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭ (সিজন-২)’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরের কথা রয়েছে। তাঁর সফরের আগে ধারাবাহিক হত্যাকা-ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশি তৎপরতা ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
সর্বশেষ সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহেরচর এলাকার জেলখানা ঘাটসংলগ্ন আলম মেম্বারের ঘাট থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতদের একজন মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫)। তিনি রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে এবং পেশায় জেলখানা ঘাটের মাঝি। অপরজন রেজাউল করিম (৩০)। তাঁর বিস্তারিত পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, সোমবার বেলা ১১টার দিকে নদীর কাদার মধ্যে প্রথমে একটি মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই এলাকায় আরও একটি মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। উভয়ের মাথায় গুলির চিহ্ন ছিল। স্থানীয়দের দাবি, মরদেহ দুটি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল।
রূপসা থানার ওসি মো. মাসুম খান দুপুরে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জোয়ারের পানিতে মরদেহ দুটি ভেসে এসেছে। একজনের পরিচয় মেহেদী হাসান সোহাগ হিসেবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি ‘বি’ কোম্পানির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অপরজনের নাম রেজাউল করিম বলে জানা যাচ্ছে। পরিচয় নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলে সিআইডি কাজ করছে।
এর আগে রবিবার রাতে তাঁতী দল নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির হত্যাকা-ের ঘটনায় ছাত্রদল নেতা আরাফাতসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন নিহতের ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্ত্য। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত শেখ সিদ্দিক (৫৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আড়ংঘাটা থানার ওসি মো. হালিমুর রহমান জানান, অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, চার থেকে পাঁচজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রায়মহল বড় মসজিদ এলাকার ‘আল-ক্যান্টিনো’ রেস্টুরেন্টে ঢুকে হুমায়ুন কবিরের ওপর হামলা চালান। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে লবণচরা থানাধীন কাশেমিয়া জামে মসজিদ থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা মাহতাব চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। লবণচরা থানার ওসি (তদন্ত) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাঁদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। থানার ওসি সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, কলিনের বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যা-সংক্রান্ত মোট আটটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি মাদক মামলা এবং একটি হত্যা মামলা। কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, মহানগরীর দুটি হত্যাকা-ের মধ্যে একটি ফ্রিজের কিস্তির পাওনা টাকা নিয়ে এবং অন্যটি মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দৌলতপুর ও আড়ংঘাটা এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক সোমবার বিকেলে বলেন, রূপসায় নদী থেকে উদ্ধার হওয়া দুজনকেই দুর্বৃত্তরা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত দুজনই সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘বি’ কোম্পানির সক্রিয় সদস্য। তিনি বলেন, মরদেহ দুটি জোয়ারের পানিতে ভেসে নদীর ঘাটে এসেছে। নিহতদের বাড়িও রূপসা এলাকায়। পুলিশ সুপার আরও বলেন, রাতে রূপসার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের টহল জোরদার ছিল। যেখানে মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখানে বিভিন্ন জাহাজ নোঙর করা ছিল। ওই স্থানে গুলি করা হলে কেউ না কেউ বিষয়টি টের পেতেন। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা অন্য কোথাও তাঁদের হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়। পরে জোয়ারের পানিতে মরদেহ দুটি ভেসে ঘাটে আসে। হত্যাকা-ের রহস্য উদ্ঘাটনে নৌ-পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি হত্যাকা-ের ঘটনা খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ধারাবাহিক এসব হত্যাকা-ের পেছনের কারণ উদ্ঘাটন, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।



