স্থানীয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর কাছে সদরে হাসপাতালে চায় কয়রাবাসী

# মুমূর্ষু রোগী নিয়ে দীর্ঘ পথের লড়াই #

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি ঃ অসুস্থ শরীর, চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, বাঁচার আকুতি নিয়ে স্বজনদের কোলে কিংবা নৌকা চালিত ট্রলারে চড়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা। কখনো দীর্ঘ সড়কপথ, কখনো উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে চিকিৎসার সন্ধানে ছুটতে হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় কারও জীবনের স্পন্দন। এমন হৃদয়বিদারক বাস্তবতা খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কয়রা উপজেলা সদরে গড়ে ওঠেনি কোনো সরকারি হাসপাতাল। ফলে উপজেলা সদর ও আশপাশের এলাকার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অসুস্থ হলে তাঁদের ছুটতে হয় উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আমাদী ইউনিয়নের জায়গীরমহলে অবস্থিত ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। গুরুতর রোগীদের যেতে হয় আরও দূরের পাইকগাছা কিংবা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ জনপদের অধিকাংশ মানুষ নি¤œ আয়ের। নদী-খালবেষ্টিত দুর্গম এলাকার এসব মানুষের কাছে চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালে যাওয়া মানে বাড়তি সময়, যাতায়াত খরচ এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই। অনেকের পক্ষে অর্থাভাবে জেলা শহরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়াও সম্ভব হয় না। কয়রা-বেদকাশী এলাকার মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার ভরসা একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র। কিন্তু সেখানে নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত ওষুধ কিংবা চিকিৎসক। আগে একজন ফার্মাসিস্টের মাধ্যমে কেন্দ্রটি পরিচালিত হলেও তাঁকে বদলি করার পর নতুন কাউকে পদায়ন করা হয়নি। ফলে কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রটিতে চিকিৎসক সংকটের মধ্যে চলছে। জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে বাগালী, মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, উত্তর বেদকাশী ও দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে এসব কেন্দ্র থেকে কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দক্ষিণ বেদকাশীর বাসিন্দাদের। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে তাঁদের পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৩১ কিলোমিটার পথ। ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নদীপথই তাঁদের একমাত্র ভরসা। নৌকা কিংবা ট্রলারে তিন-চার ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে হয়। জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ সময় কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান হয়ে দাঁড়ায়। দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ঘড়িলাল গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বাড়ি থেকে কয়রা সদর প্রায় ১৭ কিলোমিটার আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ কিলোমিটার দূরে। ইউনিয়নে একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকলেও সেখানে চিকিৎসক নেই। কেউ অসুস্থ হলে নৌকা কিংবা ট্রলারে করে হাসপাতালে যেতে হয়। উপজেলা সদরে পৌঁছাতেই তিন-চার ঘণ্টা লেগে যায়। অনেক সময় প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়। কয়রা সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, কয়রা সদরে থানা প্রতিষ্ঠার আগেই আমাদীর জায়গীরমহলে ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপিত হয়। বর্তমানে সেটি উপজেলা সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ বেদকাশী থেকে ৩১ কিলোমিটার দূরে। উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা সদরে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি।’তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিকট কয়রা সদরে একটি হাসপাতাল নির্মানের দাবি জানান। উপজেলা শিক্ষা অফিসার তপন কুমার কর্মকার বলেন, কয়রা সদরে সকল অফিসারদের বসবাস। কেউ অসুস্থ হলে দুরে যেতে হয়। অনেকেই এরকম সংবাদ শুনার পর এখানে পোষ্টিং নিয়ে আসতে চায়না। কয়রা সদরের ২ নম্বর কয়রা গ্রামের শেখ সালাহউদ্দীন লিটন বলেন, ‘কয়রা-বেদকাশী উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসক আসেন না, ওষুধও পাওয়া যায় না। রোগীরা চিকিৎসার আশায় গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। বর্তমানে কেন্দ্রটি চিকিৎসক সংকট। এটি চিকিৎসকের ব্যবস্থার পাশাপাশি উপজেলা সদরে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে মানুষের এত দূরে ছুটতে হতো না। কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ.ব.ম. আব্দুল মালেক বলেন, ‘উপজেলা সদরে একটি হাসপাতাল নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। এ বিষয়ে প্রস্তাবনাও রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। তবে আপাতত কয়রার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো চালু করে প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়ন করা হলে মানুষ কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যসেবা পেত।’
প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপকূলবাসীর প্রত্যাশা
কয়রা উপজেলা সদরের আশপাশ প্রায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে অসংখ্য মানুষ নানা প্রয়োজনে সদরে আসেন। অথচ এখানে নেই একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল। স্থানীয়দের দাবি, জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় উপজেলা সদরে ২০ থেকে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে কয়রা সদরে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। একই সঙ্গে চিকিৎসা সংকটে থাকা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো চালু করে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করবেন। যাতে জরুরি চিকিৎসার অভাবে কোনো মা, শিশু কিংবা সাধারণ মানুষকে আর অকালে প্রাণ হারাতে না হয়। কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ রেজাউল করিম বলেন, ‘কয়রা সদরে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য উর্ধতন কর্মকর্তাদেরকে একাধিক বার জানানো হয়েছে। সদরে একটি হাসপাতাল নির্মানের বিষয়টি পক্রিয়াধীন আছে। কয়রার মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয় অসুস্থ হলে যেন কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসার জন্য ছুটতে না হয়। প্রসূতি মা যেন নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারেন, দুর্ঘটনায় আহত মানুষ যেন সময়মতো চিকিৎসা পান, আর অর্থাভাবে যেন কাউকে বিনা চিকিৎসায় থাকতে না হয়। উপকূলের মানুষের কাছে একটি হাসপাতাল কেবল ইট-পাথরের ভবন নয়, এটি জীবন বাঁচানোর আশ্রয়, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার শেষ ভরসা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button