স্থানীয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রী’র কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা

মো. আশিকুর রহমান : সাজ সজ্জায় সজ্জিত উৎসবের নগরী খুলনায় আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সফরকে ঘিরে সমগ্র শহর, শহরের অলিগতিসহ সর্বত্র চলছে উৎসবের আমেজ। নগরীর নতুন রেলস্টেশন, জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ নগরের অলিগলির দেয়ালে দেয়ালে চোখধাঁধানো সব গ্রাফিতিসহ সাজসজ্জায় সজ্জিত নুতন রুপে, নতুন সাজের খুলনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বরণ করতে সম্পন্ন প্রস্তুত। জেলা স্টেডিয়ামের ভেতরে খুলনার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে আসা শিক্ষার্থী বর্ণাঢ্য আয়োজনে অংশ নেবে, প্রস্তুত স্টেডিয়ামও।
এদিকে, বিভিন্ন শ্রেনী-পেশাজীবিসহ সাধারন মানুষের সাথে কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খুলনার নানা চাওয়া ও প্রত্যাশা নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এর মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের পর রাজধানীর সাথে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল যুক্ত হলেও আজ অবদি এ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ চালু হয়নি। এ অঞ্চলের সার্বিক ও অর্থনীতিক উন্নয়নে গ্যাস চালু করা, এক সময়ের শিল্পনগরী হিসাবে খ্যাত খুলনাঞ্চলের বন্ধ সকল পাট-কলকারখানাসহ অন্যান্য কারখানাসমূহ চালু করে শ্রমিক বান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, খুলনা-যশোর মহাসড়কের সৃষ্ট যানজট নিরসন ও দুর্ঘটনারোধে চার-লেন সড়ক নির্মান, উপকূলীয় অঞ্চল দুর্যোগ মোকাবেলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়নি আজও। ওই অঞ্চলগুলোতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা, কয়রা এলাকায় সুপেয় পানির অভাব দীর্ঘদিনের, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করাসহ খুলনার উন্নয়নকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য খুলনার সুদৃঢ় নেতৃত্ব (মন্ত্রীত্ব) উপহার দেওয়া এবং সর্বশেষ খুলনার বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির বিপরীতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।
খুলনার দৌলতপুর ইউনাইটেড জুট প্রেস হাউজের শ্রমিক মো. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি প্রত্যাশা করে জানান, প্রায় দুই বছর ধরে এই অঞ্চলের পাটকল কারখানার সব ডিপার্টমেন্টের কাজ বন্ধ থাকায় এই অঞ্চলের হাজার হাজার শ্রমিক সম্পূর্নরুপে বেকার হয়ে পড়েছে, জীবিকার তাগিদে কেউ রিকশা চালাচ্ছে বা কেউ অন্য পেশার কাজ করছে। আমাদের দিন অত্যন্ত কষ্টে কাটছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছি। শ্রমিকদের ঘামে এই শহর নির্মিত হয়েছে, আজ সেই শ্রমিক অনাহারে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি প্রত্যাশা, আমাদের অনাহারী পরিবারগুলোর দিকে একটু তাকান, আমরা হাত পেতে খেতে চাই না, আমাদের কাজ দেন।
মের্সাস রাশেদ এন্টার প্রাইজের সিইও মঞ্জুর আহসান শিপুল বলেন, দৌলতপুর এলাকায় দীর্ঘ বছর কাঁচাপাটের রপ্তানী বন্ধ আছে, এ কারণে এই অঞ্চলে পাটের কাজে দুর্দশা নেমেছে, হাজারো শ্রমিক বেকার হয়েছে পড়েছে। অতীতে দেশের বৈদশিক মূদ্রা অর্জনে আমরা শতভাগ ভূমিকা রেখেছি। করোনা মহামারীর পরবর্তী সময়ে সে সময়ের সরকারি কোনো সহয়তা না পাওয়া এবং ব্যাংক থেকে চড়া সুদে টাকা গ্রহন করার পর কাঁচাপাট রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় আজ সর্বশান্ত হওয়ার পথে। তিনি খুলনাকে শিল্পাঞ্চলের খ্যাতিতে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতি প্রত্যাশা করে এই সম্ভাবনাময় শিল্পখ্যাতটি পুনরায় চালুর জোরালো দাবি জানান।
অপরদিকে, খুলনার ভৈরব সেতু বাস্তবায়নের প্রত্যাশা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি দিঘলিয়া উপজেলার বাসিন্দা সৈয়দ জাহিদুল ইসলাম বলেন, দিঘলিয়া উপজেলাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ভৈরব সেতু। চর্তুদিকে নদীবেষ্টিত এই জনপদটি ভৈরব সেতু নির্মানের মাধ্যমে খুলনা শহরের সাথে মিলিত হবে। সেতুর অভাবে গভীর রাতে রোগী নিয়ে শহরে যেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্বজনদের। তাছাড়া উপজেলাবাসীর নৌকা, ট্রলার বা ফেরি স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এ সেতুর নির্মান কাজের অগ্রগতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী’র সু-নজর কামনা করছি।
এদিকে, খুলনা এখন খুনের নগরী, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও খুনের ঘটনা ঘটছে। গত ১৭ মাস আগে দুবৃর্ত্তদের হামলায় খুন হওয়া খুলনা মহানগর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমানের বিধবা স্ত্রী জানান, কারো কাছে কিছু প্রত্যাশা নেই, মাহবুব রাজপথের নেতা ছিল, ওকে আপনারা ভুলে যেয়েন না। প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের প্রতি কান্নারত কন্ঠে তিনি প্রত্যাশা জানান, এ খুনের নগরীতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন। আর যেন কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। আর যেন কোনো সন্তান পিতা হারা না হয়, আর যেন কোনো স্ত্রীকে স্বামী হারা হতে না হয়। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।
গৃহিনী তানিয়া রহমানের প্রত্যাশা, আমরা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষেরা বহু বছর ধরে নানামুখি সুবিধা বঞ্চিত। পদ্মা সেতুর হওয়ার পরও এখনো বিভাগীয় শহর খুলনা ও তার জেলাগুলো গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়নি। বর্তমান জীবন-যাপনে সব স্তরের মানুষ গ্যাস ব্যবহারে অভ্যস্ত, যে কারনে গ্যাসের চাহিদা বহুগুনে বেড়েছে। এই চাহিদার কারনে এলপিজি গ্যাসের সংকট রয়েছে। দাম বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে অচিরেই দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান তিনি।
বছরের পর বছর ধরে সুপেয় পানির কষ্টে থাকা খুলনার কয়রা সদর ইউনিয়নের ৫নং কয়রা গ্রামের রাফেজা খাতুন প্রত্যাশা করে জানান, এই জনপদটি দীর্ঘকাল হতে দেশের সব উপজেলা থেকে সুবিধা বঞ্চিত উপজেলা। বছরের বছর ধরে এই জনপদটিতে সুপীয় পানির অভাব আর টেকসই বেড়িবাধে নির্মিত হয়নি। একদিকে, সুপেয় পানি পেতে নারীদের কলসি ভরতে সুদীর্ঘ ৪/৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এ কষ্ট একদিনের নয়, নিত্যদিনের। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই জনপদের পক্ষে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিতে জোরালো দাবি জানান।
পথচারী মো. শাহাদাত হোসেন খুলনা-যশোর মহাসড়কের সৃষ্ট যানজট ও বিভিন্ন ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনারোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি খুলনা-যশোর মহাসড়কে চার-লেন সড়ক হিসাবে নির্মানের প্রত্যাশা করেন।
খুলনার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সু-শাসনের জন্য নাগরিক খুলনা জেলা সভাপতি এড. কুদরতই খুদা জানান, খুলনাবাসী তথা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষগুলো সরকারের নানামুখি উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে। খুলনার উন্নয়নে তার প্রতি আমার প্রথম প্রত্যাশা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস চালুর ঘোষণাটি তিনি দিয়ে যাবেন। একই সাথে খুলনাঞ্চলে বন্ধ সব পাট-কলকারখানাসহ অন্যান্য কারখানা সমূহ চালু করে শ্রমিকবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। এছাড়া খুলনার উন্নয়নকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য খুলনার সুদৃঢ় নেতৃত্ব (মন্ত্রিত্ব) দেওয়ার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এ নাগরিক নেতা।
খুলনা সওজ, সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হক জানান, খুলনা-যশোর মহাসড়কের আফিলগেট হতে জোড়াগেট পর্যন্ত চার-লেন সড়কে উন্নতির জন্য পরিকল্পনা কমিশনের সবুজ পাতায় অর্ন্তভুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ সড়ক নির্মান হলে একদিকে সড়কের যানজট কমবে, অন্য কমবে দুর্ঘটনা প্রবণতাও।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা জানান, বিগত ১৭ বছর ধরে এই অঞ্চলটি অবহেলিত হয়ে একটি মৃতপ্রায় নগরীতে পরিণত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফরটি খুলনাবাসীর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার এই সফর ঘিরে খুলনার সার্বিক উন্নয়ন, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল দিকনির্দেশনা আসবে বলে আমরা আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে প্রস্তুত খুলনা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে খুলনার সার্বিক আইন শৃঙ্খলা বিষয়ে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোঃ আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, মাঠপর্যায়ে বিশেষ তদারকি ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, র‌্যাব, এসআরবি এবং সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্বে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে খুলনা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button