স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় গুলি করে হত্যা যেন থামছেই না প্রধানমন্ত্রীর সফরেও প্রকাশ্যে বিএনপি নেতার ছেলেকে খুন

# ৩৩ মাসে মহানগরীর আট থানায় ৯৬ খুন
# চলতি বছর জেলা ও মহানগরীতে ৭৫

কামরল হোসেন মনি ঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফর ও অবস্থানকে কেন্দ্র করে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সড়কে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। তবে এর মধ্যেই একের পর এক হত্যাকা-ে খুলনা মহানগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর চলাকালে এবার ডুমুরিয়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তরিকুল ইসলাম শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে। তিনি ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম শেখের ছেলে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুর আনুমানিক ১টা ৫০ মিনিটে উপজেলার আমভিটা রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় গফফারের চায়ের দোকানে এ হত্যাকা- ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তরিকুল বাড়ির সামনে একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। কারা এবং কী কারণে এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, নিহত তরিকুল স্থানীয় বিএনপি নেতার ছেলে। ঘটনাস্থলে পুলিশ রয়েছে। হত্যাকা-ে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাট-মোংলা সফর শেষে খুলনার পথে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭ (সিজন-২)’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর ও অবস্থানকালে এমন হত্যাকা-ের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফরের মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা মহানগরী ও রূপসায় চারটি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মহানগরীতে দুটি হত্যাকা- এবং রূপসায় দুটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহেরচর এলাকার জেলখানা ঘাটসংলগ্ন আলম মেম্বারের ঘাট থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতদের একজন মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫)। তিনি রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে এবং পেশায় জেলখানা ঘাটের মাঝি। অপরজন রেজাউল করিম (৩০)।
এর আগে রবিবার (১ নভেম্বর) রাতে তাঁতী দল নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির হত্যাকা-ের ঘটনায় তাঁর ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্ত্য ছাত্রদল নেতা আরাফাতসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত শেখ সিদ্দিক (৫৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, চার থেকে পাঁচজন দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রায়মহল বড় মসজিদ এলাকার ‘আল-ক্যান্টিনো’ রেস্টুরেন্টে ঢুকে হুমায়ুন কবিরের ওপর হামলা চালান। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে লবণচরা থানাধীন কাশেমিয়া জামে মসজিদ থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা মাহতাব চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

লবণচরা থানার ওসি (তদন্ত) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাঁদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। থানার ওসি সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, কলিনের বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যা-সংক্রান্ত মোট আটটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি মাদক মামলা এবং একটি হত্যা মামলা।
এর আগে গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সুন্দরবন পরিদর্শন, দাকোপে অবতরণ ও মোংলা পরিদর্শনের দিন ভোরে খুলনা মহানগরীর মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় তুষার (৩৫) নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় জিন্নাহ পাড়া এলাকায় মায়ের সামনে মেয়ে খুশি আক্তারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর আট থানায় ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৩০টি হত্যাকা- ঘটেছে। সে হিসাবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ মাসে মহানগরীতে হত্যাকা-ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৬টিতে। এছাড়া চলতি বছরে জেলা ও মহানগরী মিলিয়ে মোট হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে ৭৫টি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকা-ের অধিকাংশের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধের মতো কারণ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর একাধিক সফরকে ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হলেও খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকা- থামছে না। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, মরদেহ উদ্ধার এবং রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন ব্যক্তিদের হত্যার ঘটনায় জনমনে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হত্যাকা-ের রহস্য উদ্ঘাটন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button