জলাভূমি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন

জলাভূমিকে পৃথিবীর কিডনি বলে অভিহিত করা হয়। মানুষের দেহে বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি বর্জ্য যেমন কিডনির মাধ্যমে পরিষ্কার হয়, তেমনি পৃথিবীর অনেক বর্জ্য পরিষ্কার হয় জলাভূমির মাধ্যমেই। অসংখ্য স্থলজ ও জলজ প্রজাতির খাদ্য জলাভূমিতে বেশি পরিমাণ থাকার কারণে এখানকার জীববৈচিত্র্য জলাভূমিসংলগ্ন অন্যান্য বাস্তুতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ হয়। জলাভূমি নানা ধরনের অজৈব পুষ্টি পদার্থ ও বায়ুম-লীয় কার্বনের আধার হিসেবে কাজ করে। অনেক বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বাসস্থান এই জলাভূমি। বন্যার পানি ধারণ, উপকূলরেখাকে রক্ষা ও ভূগর্ভস্থ জলাধার পুনর্ভরাট করে জলাভূমি। খাদ্য উৎপাদন, সেচ, পর্যটন, বিনোদন, কর্মসংস্থান ও সুস্থায়ী জীবিকা তথা পানি নিরাপত্তার জন্য জলাভূমি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে জলাভূমি মানুষ তথা জীবজগৎ ও প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এক বাস্তুতন্ত্র। জলাভূমির অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের পুরো বাস্তুতন্ত্র। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অষ্টাদশ শতক থেকে বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। মূলত কৃষি, বসবাসের জন্য বাড়িঘর তৈরি, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও শিল্পকারখানা তৈরির প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর নানা জায়গায় জলাভূমিকে ধ্বংস করা হয়েছে। বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল জলাভূমি। নদী, মোহনা, ম্যানগ্রোভ, হাওর, বাঁওড়, বিল, জলাধার, দিঘি, পুকুর ইত্যাদি মিলিয়ে কয়েকটি প্রকাশনায় বাংলাদেশে জলাভূমির আয়তন ৭০ থেকে ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশের মোট আয়তনের অর্ধেকের মতো হচ্ছে জলাভূমি। তবে একসময় বাংলাদেশে জলাভূমির আয়তন ছিল আরো অনেক বেশি। বাংলাদেশের জলাভূমির মারাত্মক সমস্যা এখন দাঁড়িয়েছে সেডিমেন্ট। উজানের পাহাড় থেকে পানি নেমে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে পলি। বছরে এক বিলিয়ন টন পলি আসায় হাওর, জলাভূমি ও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এটা প্রতিহত করার সক্ষমতা আমাদের নেই, তবে ব্যবস্থাপনা করার সুযোগ আছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ মাটি কেটে হাওরের নাব্যতা সারা বছরের জন্য বাড়ানো যায়। জলাভূমির নাব্যতা বাড়াতে পারলে সারা বছর মাছ চাষ করে ছয় থেকে সাত গুণ বেশি আয় করা সম্ভব হবে। ফলে জিডিপি বাড়বে। জলাভূমি এলাকায় কয়েক কোটি গাছ লাগালে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে। প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ বসবাসের উপযোগী হলে সেখানকার বাজেট ও উন্নয়ন উভয়েরই উন্নয়ন ঘটবে। পর্যটনকে সহনশীল করতে পারলে মানুষের মনোজাগতিক উন্নয়ন ও অর্থ আয় বাড়বে। মাছ ও পাখির অভয়ারণ্য তৈরি করলে পরিবেশকে আরও উন্নত করা সম্ভব।