ব্যাংক খাতে দরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের ব্যাংক খাত যেন একটি পরিকল্পিত লুটপাটের কারখানায় রূপ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোর মূল দায়িত্ব অর্থনীতি সচল রাখা হলেও, বাস্তবে তারা হয়ে উঠেছে দলীয় প্রভাবশালীদের দুর্নীতির গন্তব্যস্থল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পর্ষদ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়ায় মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দলীয় পরিচয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকরাই বরং এই লুটপাটের পথ সুগম করেছেন। এই দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক খাতের দুর্বৃত্তরা শুধু ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি তারা সবল ব্যাংকগুলো একে একে দখলে নিয়ে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। ফলাফল? তারল্য সংকট, ঋণ বিতরণে স্থবিরতা, ব্যাংকের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি-সব মিলিয়ে আজ দেশের ব্যাংক খাত দাঁড়িয়ে আছে এক অস্থিতিশীল ধ্বংসস্তূপের মুখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতে যে লুটপাট হয়েছে তার মধ্যে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। এর মধ্যে তিন লাখ কোটির টাকা বেশি পাচার হয়েছে। বাকি প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। সব মিলে আমানতকারীদের সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তা বিনিয়োগ করে। এ থেকে ব্যাংক সুদ বা মুনাফাসহ নির্দিষ্ট সময় পর অর্থ ফেরত পায়। সেগুলো দিয়ে আমানতকারীদের মুনাফাসহ মূল অর্থ ফেরত দেয়। পাশাপাশি ব্যাংকের কর্মীদের বেতন ভাতা, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদানসহ অন্যান্য খরচ বহন করে। ব্যাংক ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ বলে তাদের নিয়মিতভাবে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়, ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য রিজার্ভ তহবিলের আকার বাড়াতে ও মূলধন বাড়াতে হয়। কিন্তু ব্যাংক খাত থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়ায় সেগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের কোনো আয় হচ্ছে না। জালিয়াতি হয়েছে বলে আমানতের ওইসব অর্থ ফেরতও আসছে না। এ কারণে লুটপাটের শিকার ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ঋণের নামে সীমাহীন লুটপাটের মতো অন্য অনেক সমস্যার মূলে রয়েছে এ খাতের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব। বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে অভ্যন্তরীণ সুশাসন ক্রমেই ভেঙে পড়তে দেখেছি আমরা। এ নিয়ে বারবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কার্যত কিছুই হয়নি। সত্যি কথা বলতে, এ খাতের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের বিষয়টিতে গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার এই নানামুখী উদ্যোগ অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে।