সম্পাদকীয়

শিল্প বন্ধ, স্বপ্ন ভেঙে পড়ছে

গাজীপুর দেশের অন্যতম শিল্পঘন অঞ্চল। একসময় এখানকার টঙ্গী, চক্রবর্তী বা গাছা এলাকায় পোশাক কারখানার সাইরেন ছিল জীবনের ছন্দ। শ্রমিকদের কোলাহল, হাটবাজারের ভিড়, বাসা ভাড়ার চাহিদা-সব মিলিয়ে এই জনপদ ছিল এক গতিশীল অর্থনীতির মুখ। কিন্তু আজ এখানেই নেমে এসেছে হাহাকার। চাকা থেমে যাচ্ছে শিল্পের, ছিন্ন হচ্ছে লক্ষ জীবনের স্বপ্ন। মাত্র এক বছরে গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় ৭৩ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যাঁদের অনেকেই এখন অটোরিকশা চালানো, বাসাবাড়ির কাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থনৈতিক এই বিপর্যয়ের প্রতিফলন শুধু শ্রমিকদের জীবনে নয়-প্রতিফলিত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। দোকানে নেই ক্রেতা, বাড়িভাড়া পড়ছে ফাঁকা, বিদ্যালয়ে কমেছে শিক্ষার্থী। এই সংকটের মূলে রয়েছে একাধিক কারণ-রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত বৈশি^ক অর্ডার সংকট, ব্যাংকের ঋণপুনঃতফসিল করতে গড়িমসি, কার্যাদেশ বাতিল এবং ব্যাংকগুলোর ‘অসহযোগিতা’। টঙ্গীর সিজন ড্রেসেস কারখানার উদাহরণ বিশেষভাবে দুঃখজনক। সফল রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে প্রায় সাড়ে তিন কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল, অথচ ব্যাংকের অতিরিক্ত সুদ কেটে নেওয়ার মতো অনমনীয় নীতির কারণে আজ তা বন্ধ। শুধু সেই নয়-বেক্সিমকো, মাহমুদ জিন্স, লা-মুনি অ্যাপারেলসসহ বিজিএমইএভুক্ত আরও ২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের বন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের ভাবতে বাধ্য করে-দেশের শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা ব্যবস্থায় কী মারাত্মক ফাঁক রয়েছে? এই সংকট কেবল কিছু ‘প্রতিষ্ঠান’ বন্ধ হওয়ার গল্প নয়, এটি হলো লক্ষ মানুষের জীবিকা হারানোর, অর্থনীতির একটি স্তম্ভ কেঁপে ওঠার, এবং সবচেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়ার গল্প। একটি কারখানা বন্ধ মানে শুধু শ্রমিকের চাকরি হারানো নয়-তাঁর সন্তানের স্কুলছাড়া হওয়া, দোকানির বিক্রি কমে যাওয়া, বাড়ির মালিকের কিস্তি দিতে না পারা। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে: যখন বড় বড় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহায়তা রয়েছে? কারখানা রক্ষায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নমনীয়তা, বিশেষ প্যাকেজ বা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কোথায়? আমরা কেবল শ্রমিকদের শোচনীয় অবস্থাই দেখছি, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পথ যেন কেউ খুঁজছে না। সরকার, বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য ব্যাংক ঋণপুনঃতফসিল, ট্যাক্স ছাড়, এবং অর্ডার আনার জন্য কূটনৈতিক সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। না হলে শ্রমিকঘন অঞ্চলগুলোতে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। শিল্প বন্ধ মানে শুধু অর্থনীতি থেমে যাওয়া নয়, এর মানে হলো একটি দেশের স্বপ্ন, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি থমকে যাওয়া। এই থেমে যাওয়া যেন স্থায়ী না হয়, সেটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button