মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমা-ভবিষ্যতের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা

বাংলাদেশে শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে অর্জন থাকা সত্ত্বেও মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে গত এক দশকে কোনো অগ্রগতি হয়নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জন্মের প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ পায় গড়ে মাত্র ৪৯ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ ৫১ শতাংশ নবজাতকই মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত। বিডিএইচএসের তথ্য বলছে, ২০১১ সালে এই হার ছিল ৬৪ শতাংশ, ২০২২ সালে তা নেমে এসেছে ৫৫ শতাংশে-যা এক দশকে প্রায় ৯ শতাংশ পতনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞরা এ অবনতির পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, শিশুখাদ্য শিল্পের আগ্রাসী বিপণন মায়েদের বিভ্রান্ত করছে। টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম ও বাজারের রঙিন বিজ্ঞাপন অনেককে ফর্মুলা দুধ বা প্যাকেটজাত দুধের দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে মাতৃত্বকালীন ছুটি মাত্র তিন-চার মাস হওয়ায় মায়েরা কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার আগে থেকেই বিকল্প খাদ্যের পথ বেছে নিচ্ছেন। তৃতীয়ত, প্রসূতি মা ও পরিবারের কাছে সঠিক তথ্য ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি পরিস্থিতি আরও জটিল করছে। গবেষণা বলছে, জন্মের পর প্রথম ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে বুকের দুধ দেওয়া এবং প্রথম ছয় মাস একচেটিয়াভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করানো হলে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার নবজাতকের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। মায়ের দুধ শুধু পুষ্টি নয়, এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার প্রাকৃতিক প্রতিষেধকও বটে। এ অবস্থায় জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। বেসরকারি খাতে অন্তত ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা। এছাড়াও সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে স্তন্যদান কর্নার স্থাপন। পাশাপাশি শিশুখাদ্য বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ। গর্ভাবস্থা থেকেই মায়েদের পুষ্টি ও স্তন্যপান বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং পরিবার ও কর্মস্থলে স্তন্যপানবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। মাতৃদুগ্ধ পানের হার হ্রাস শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও হুমকি। শিশুদের সুস্থ ও সুরক্ষিত বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে এখনই সরকার, বেসরকারি খাত ও সমাজকে একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংকট অবহেলা করলে তা আগামী দিনে জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূল্য চুকিয়ে দেবে।