সম্পাদকীয়

টেস্ট বাণিজ্য বন্ধ করুন

সারাদেশে রাজনীতি ও অর্থনীতি দুই ধরনের অস্থিরতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে দেশজুড়ে। এখন মানুষ তার পাচঁটি মৌলিক চাহিদা মিটাতে হিমশিম খাচ্ছে। তার মাঝে চিকিৎসা নিয়ে নানা জটিলতায় পরে আছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা সেক্টরে টেস্ট বাণিজ্য নিয়ে মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরী হয়ে আছে। টেস্ট বাণিজ্যের কারণে মানুষ এখন নাজেহাল হয়ে আছে। বাংলাদেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ছোট-বড় হাসপাতাল। মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন পূরণের পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে। চিকিৎসার মতো মহান পেশায় অনৈতিকভাবে কমিশন ব্যবসা একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরীক্ষা করানো হচ্ছে, শুধু কমিশন অর্জনের জন্য। ফলে একদিকে যেমন চিকিৎসার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি। বর্তমানে দেশে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার চিকিৎসককে গোপনে কমিশন প্রদান করে থাকে। ফলে রোগীকে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে বাধ্য করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে যেখানে মাত্র ২-৩টি টেস্ট যথেষ্ট, সেখানে রোগীকে ১৪-১৫টি টেস্ট করানো হয়। এতে রোগীকে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এই ভোগান্তির প্রধান শিকার। অনেক ক্ষেত্রেই এসব টেস্ট রোগ নির্ণয়ে বিশেষ কাজে আসে না, শুধু খরচ বাড়ায়। সরকার স্বাস্থ্যসেবায় নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়ালেও এখনো প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ বেসরকারি চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। অথচ সরকারি হাসপাতালের বহু চিকিৎসক রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে কমিশন নেন, বিশেষ করে কনসালট্যান্ট, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপকরা এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। বড় প্রতিষ্ঠানের কমিশন হারও বেশি। ফলে প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসকরা লাভবান হলেও রোগীরা চরম ভুক্তভোগী হন; প্রতিবছর অর্ধকোটি মানুষ চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কমিশন বাণিজ্যের কারণে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে স্বাস্থ্য খাত ভয়াবহ সংকটে পড়বে। বাংলাদেশে যে হারে নতুন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট হাসপাতাল গড়ে উঠছে, সেখানে কঠোর নীতিমালা না থাকলে রোগীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও বৈষম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি-বেসরকারি, লাভজনক-অলাভজনক—সব প্রতিষ্ঠান মিলে ১৮ কোটি মানুষের সেবা দেওয়ার যে রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে সবার অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button