সম্পাদকীয়

পারিবারিক সহিংসতা-আইন প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতার পরীক্ষা

দেশে পারিবারিক সহিংসতার চিত্র ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩২২ জন। এর মধ্যে ১৩৩ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন, আরও অনেকে শিকার হয়েছেন স্বামীর পরিবারের সদস্য কিংবা নিজ পরিবারের সহিংসতার। শুধু হত্যাই নয়, একই সময়ে আত্মহত্যা করেছেন ১১৪ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য ভাঙা পরিবার, শোকাহত সন্তান ও সমাজের গভীর সংকট। জাতীয় নারী সুরক্ষা হেল্পলাইন (১০৯) ও জরুরি সেবা (৯৯৯)-এর তথ্যও উদ্বেগজনক। সাত মাসে ৪৮ হাজারেরও বেশি নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে সহায়তা চেয়েছেন। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে নারী নির্যাতনের ঘটনায় এসেছে ১৭ হাজারের বেশি কল। এসব তথ্য স্পষ্ট করে যে, পারিবারিক সহিংসতা আর ব্যক্তিগত গ-িতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বড় সামাজিক সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল শেকড় পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতায়। শাস্তির ভয় যখন থাকে না, তখন অপরাধী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পাশাপাশি, অনেক নারী নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা বা আশ্রয়ের অভাবের কারণে। সমাধানের পথ একমুখী নয়। আইনকে বাস্তবায়নযোগ্য করতে হবে, যাতে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়। এছাড়াও নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিয়ে ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সর্বোপরি, শিশু বয়স থেকেই শিক্ষার মাধ্যমে লিঙ্গ সমতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিসংখ্যানের ভেতরে লুকানো মানবিক বিপর্যয়কে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পারিবারিক সহিংসতা কেবল নারীর নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না; এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষয়ে দিচ্ছে। তাই এখনই সময় কঠোর আইন প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে সহিংসতার শেকড় উপড়ে ফেলার।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button