দখল ও দূষণে মুমুর্ষূ কর্নফুলী নদী নদীকে বাচাঁতে উদ্যোগ নিন

দখল-দূষণের কবলে পড়েছে কর্ণফুলী নদী। দুই পাড়ে গড়ে ওঠা কল-কারখানা এবং নগরের ময়লা-আবর্জনা দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। কর্ণফুলীতে এখন শুধু বর্জ্যই মিলবে। আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এই নদী। দেখা গেছে, নদীতে সরাসরি ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। পানি শুকিয়ে পড়ে গেছে চর, দূষণে নিজের সৌন্দর্য হারিয়েছে চিরযৌবনা কর্ণফুলী। ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতিটি নদ-নদীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তার আলোকে নদীগুলোর প্রাণপ্রবাহ সংরক্ষণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ‘অর্থনৈতিক নদী’ কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হবে যে কোনো মূল্যে। কেননা কর্ণফুলী দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের ধারক। ভারতের মিজোরামের মমিত জেলার শৈতা গ্রাম (লুসাই পাহাড়) হতে শুরু হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে কর্ণফুলী নদী। এর মোহনাতে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর অবস্থিত। এই নদীর দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার। কথিত আছে, আরাকানের এক রাজকন্যা চট্টগ্রামের এক আদিবাসী রাজপুত্রের প্রেমে পড়েন। এক জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে তারা এই নদীতে নৌ-ভ্রমণ উপভোগ করছিলেন। নদীর পানিতে চাঁদের প্রতিফলন দেখার সময় রাজকন্যার কানে গোঁজা একটি ফুল পানিতে পড়ে যায়। ফুলটি হারিয়ে কাতর রাজকন্যা সেটা উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু প্রবল স্রোতে রাজকন্যা ভেসে যান, তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। রাজপুত্র রাজকন্যাকে বাঁচাতে পানিতে লাফ দেন, কিন্তু সফল হননি। রাজকন্যার শোকে রাজপুত্র পানিতে ডুবে আত্মাহুতি দেন। এই করুণ কাহিনী থেকেই নদীটির নাম হয় কর্ণফুলী। দখল ও দূষণে নদীটি এখন মৃত প্রায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীতে পড়া বর্জ্য, জাহাজ থেকে নিঃসরিত তেল ও শিল্প-কারখানার বর্জ্য নিঃসরণের কারণে কর্ণফুলীর পানিতে সালমোনেলা, বিব্রিও, ইকোলাই, স্ট্রেপটোকক্ষাই, স্টেফাইলোকক্ষাইয়ের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বেড়ে গেছে। কর্ণফুলী নদীর পানিতে ক্ষতিকারক বিব্রিও নামে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ ৬৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। আর সালমোনেল ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ ৩২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এসব ব্যাকটেরিয়ার কারণে নদীর পানি ব্যবহারকারী পরিবারগুলো পানিবাহিত ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু বছরের পর বছর দূষণ হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। যদিও তারা দাবি করছে, নদী দূষণ রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, নদী দূষণকারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হচ্ছে। কর্ণফুলীর দুই পাশে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও কিছু দুষ্ট চক্র অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। জেলা প্রশাসন ও বিগত সরকারগুলোর গাফিলতি ও সদিচ্ছার অভাবে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হয়নি। ফলে নদী বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নাগরিকেরা মিলে এ নদীকে বাঁচাতে হবে।