সম্পাদকীয়

প্রশাসনে পদ-পদায়নের বিশৃঙ্খলা: সমাধান কোথায়?

বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে পদ-পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনে চলমান বিশৃঙ্খলা শুধু প্রশাসনিক কাঠামোকেই নয়, উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি ও গুণগত মানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেড় হাজারের মতো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন, যার মধ্যে প্রায় এক হাজার ১০০টি প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি। নীতিমালা অনুযায়ী, এসব বড় প্রকল্পে যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা বহু বছর ধরে উপেক্ষিত হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালনায় অভিজ্ঞ ও যোগ্য কর্মকর্তার ঘাটতির কথা বলে একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একদিকে প্রয়োজনীয় পদে কর্মকর্তার অভাবের দাবি, অন্যদিকে একই সময়ে মন্ত্রণালয়গুলোতে সংযুক্তি ও ওএসডি হিসেবে কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা কয়েক শ’-এ এক প্রশাসনিক বৈপরীত্য। অনুমোদিত পদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও একাধিক অনুবিভাগ বা প্রকল্পের দায়িত্বে একই ব্যক্তিকে বসানো, প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট ব্যর্থতার প্রমাণ। অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার ও পছন্দ-অপছন্দের সংস্কৃতি পদায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনপ্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা সচিবালয়ের বাইরে যেতে চান না, ফলে মাঠ প্রশাসন বা প্রকল্প বাস্তবায়নে অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। বিশেষ সুবিধা, বিলাসবহুল যানবাহন ও বিদেশ সফরের সুযোগ আছে-এমন প্রকল্পের পিডি হতে তদবিরের প্রবণতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে কঠোরভাবে বিদ্যমান বিধি-বিধান প্রয়োগ জরুরি। পদের অতিরিক্ত কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বে সুষম বণ্টন না হওয়া অগ্রহণযোগ্য। দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রকল্পের প্রয়োজনের ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে; রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পছন্দকে নয়। একই সঙ্গে ‘ইনসিটু’ সংস্কৃতির অপব্যবহার বন্ধ করে প্রকল্প ও মাঠ পর্যায়ে যোগ্য কর্মকর্তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি কার্যকর প্রশাসনই উন্নয়ন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের চাবিকাঠি। পদ-পদায়নের অদক্ষতা ও বিশৃঙ্খলা যদি অব্যাহত থাকে, তবে এর খেসারত দিতে হবে জনগণকেই-বিলম্বিত প্রকল্প, অপচয় হওয়া অর্থ, এবং অধরা উন্নয়ন লক্ষ্য দিয়ে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button