সম্পাদকীয়

নওগাঁর হিমাগারে আটকে কৃষকের স্বপ্ন-আলুর বাজারে সংকট নীতি ও বাস্তবতার

নওগাঁ জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য আলু চাষ একসময় লাভজনক ফসল হিসেবে বিবেচিত হতো। হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে অফ সিজনে বিক্রির মাধ্যমে লাভের আশায় তাঁরা যেভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন, তা এখন পরিণত হয়েছে ভয়াবহ লোকসানে। উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছে ২৪ থেকে ২৬ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়। এ অবস্থায় হিমাগারের ভাড়া পরিশোধের আশঙ্কায় অনেকেই এখনো মজুত আলু বের করছেন না-যা সামনে আরও বড় ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর নওগাঁয় পাঁচ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ হাজার টন বেশি। উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার পরও বাজারে দাম কমে যাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে কোটি টাকায়। কেবল নওগাঁ জেলার হিমাগারগুলোতেই প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে, যার বিপরীতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র স্থানীয় নয়-এটি দেশের কৃষি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। উৎপাদন বৃদ্ধিকে আমরা সাফল্য হিসেবে গণ্য করলেও, তার বিপণন ব্যবস্থায় এখনো নেই পর্যাপ্ত পরিকল্পনা, সংরক্ষণ নীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা। সরকার নির্ধারিত ২২ টাকার ন্যায্যমূল্য কাগজে থাকলেও মাঠে তার বাস্তবায়ন নেই। ফলে কৃষকরা ক্রমে আস্থা হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ মৌসুমে আলু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। অন্যদিকে, হিমাগার মালিকরাও বিপাকে। আলু বের না হওয়ায় সংরক্ষণাগারের জায়গা খালি হচ্ছে না, আর সময়সীমা পার হলে আলু নষ্ট হয়ে পড়বে। তখন পচা আলু নিজ খরচে অপসারণ করতে হবে, যা আরও আর্থিক চাপ তৈরি করবে। এই অবস্থায় প্রয়োজন দ্রুত নীতিগত হস্তক্ষেপ। সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা ও বিপণন চেইনে কার্যকর সমন্বয় আনতে হবে। পাশাপাশি আলু রপ্তানি, প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও কৃষক পর্যায়ে সরাসরি ক্রয় কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কৃষকের ঘামেই দেশের খাদ্যভিত্তি গড়ে উঠেছে। তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেলে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, পুরো কৃষি অর্থনীতিই ঝুঁকির মুখে পড়বে। নওগাঁর আলুর সংকট তাই কেবল বাজারের নয়, এটি নীতির ঘাটতি ও পরিকল্পনার দুর্বলতার এক স্পষ্ট উদাহরণ।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button