সম্পাদকীয়

বৈষম্য কমানো এখন সময়ের দাবি

বৈষম্য যে কোনো অর্থনীতিরই অন্তর্নিহিত বাস্তবতা। তবে যখন তা সীমা ছাড়িয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন বিষয়টি জাতীয় উদ্বেগের পর্যায়ে চলে যায়। প্যারিসভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট-২০২৬’-এর তথ্য বাংলাদেশে বৈষম্যের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনেছে। এতে দেখা যায়, দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের কাছে রয়েছে মোট সম্পদের ২৪ শতাংশ। আয়ের ক্ষেত্রেও তাদের দখল মোট জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ। এই উপাত্তগুলো স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশে সম্পদের বৈষম্য আয়ের তুলনায় অনেক বেশি গভীর। প্রতিবেদনটিতে বৈশি^ক বৈষম্যের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সামগ্রিকভাবেই উদ্বেগজনক। মাত্র ১০ শতাংশ ধনী শ্রেণির হাতে বিশে^র তিন-চতুর্থাংশ সম্পদ থাকা বৈশি^ক অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর অসাম্যকে প্রতিফলিত করে। তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশ বৈষম্যের দিক থেকে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ বৈষম্য স্থিতিশীল থেকে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংহতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শীর্ষ ১০ শতাংশ আয়ের মানুষের কাছে জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ এবং নিচের ৫০ শতাংশের কাছে মাত্র ১৯ শতাংশ থাকা আয় বণ্টনের বৈসাদৃশ্যকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। সম্পদের ক্ষেত্রেও চিত্র আরও তীব্র-শীর্ষ ১০ শতাংশের কাছে ৫৮-৫৯ শতাংশ সম্পদ, যেখানে নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর হাতে রয়েছে মাত্র ৪.৭ শতাংশ। এই বৈষম্য সৃষ্টির পেছনে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সুযোগের অসম বণ্টন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ঘাটতি অন্যতম কারণ। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, আয় বৈষম্য বাড়লেই সম্পদের বৈষম্য বাড়ে-এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদের মতে, দেশের অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত বিকাশের উপযুক্ত সুযোগ পায় না। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সীমিত প্রবেশাধিকার বৈষম্যকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জিনি অনুপাত ০.৪৯-যা বৈষম্যের উচ্চমাত্রার ইঙ্গিত দেয়-তাও একই বাস্তবতা তুলে ধরে। এই বৈষম্য সামাজিক ভারসাম্য, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ মাত্র ২২ শতাংশ হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা পর্যাপ্তভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না-যা বৈষম্যকে আরও গভীর করে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-এ বৈষম্য কমানোর পথে কতদূর অগ্রগতি সম্ভব? শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, করব্যবস্থায় সংস্কার আনা এবং নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বিস্তৃত করা-এসবই হতে পারে বৈষম্য হ্রাসের মূল উপায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্থবহ হতে হলে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হয়। বৈষম্য কমাতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপই পারে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে আরও টেকসই ও মানবিক করে তুলতে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button