জীবাশ্ম জ্বালানিতে এডিবির একপেশে বিনিয়োগ: টেকসই জ্বালানি রূপান্তরে প্রশ্ন

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আজ যে বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি-তার অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ভারসাম্যহীনতা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিনিয়োগ কাঠামো সম্পর্কিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকে নতুনভাবে উন্মোচিত করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর প্রকল্পে ব্যাংকটির ব্যাপক প্রতিশ্রুতি, আর বিপরীতে নবায়নযোগ্য খাতে সীমিত অংশগ্রহণ, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার ৫৭০টি জ্বালানি প্রকল্পে ঘোষিত ৯২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এ টাকার বড় অংশই গ্যাসকেন্দ্রিক প্রকল্পে-মাত্র পাঁচটি খাতে ৫ দশমিক ৯৯৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬৫৯ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা। অর্থাৎ বিনিয়োগ কাঠামো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। নবায়নযোগ্য খাতে বরাদ্দ মাত্র ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ; সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগও সীমিত, আর বায়ু বিদ্যুতে নেই কোনো অর্থায়ন। এডিবি-অর্থায়িত রূপসা (৮০০ মেগাওয়াট) এবং মেঘনাঘাট (৭১৫ মেগাওয়াট) কেন্দ্র চালু না হওয়া এই সংকটের আরেক উদাহরণ। জ্বালানি ঘাটতি ও পাইপলাইন সমস্যার কারণে কার্যক্রম শুরু না হলেও রাষ্ট্রকে উচ্চ ব্যয়ের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এটি অর্থনীতিতে অকার্যকর ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করছে এবং ঋণঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তাহীনের এমন দৃষ্টান্ত কতটা নীতিগতভাবে সঙ্গত তা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন রয়েছে। নবায়নযোগ্য খাতে নীতিগত বাধা, আর্থিক প্রণোদনার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা এই খাতের প্রসারকে থামিয়ে রেখেছে-সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে তা স্পষ্ট। শিল্প খাতে সৌর স্থাপনায় অগ্রগতি থাকলেও আওতাজুড়ে থাকা বাসাবাড়ির সোলার সিস্টেমগুলোর অধিকাংশই অকার্যকর, যা নবায়নযোগ্য অবদানের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিচ্ছে। সৌর যন্ত্রপাতির শুল্ক কমানো, অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করা এবং আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি ছাড়া এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পরিবেশগত ঝুঁকি। এডিবি-সমর্থিত পাঁচটি কেন্দ্রের সম্ভাব্য মোট কার্বন নিঃসরণ ১৭৪ দশমিক ৭১ মিলিয়ন টন-যা বাংলাদেশের জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি নদীতীর দখল, স্থানীয় মানুষের জীবিকা হারানো এবং সামাজিক ক্ষতির দিকগুলোও বহু বছরের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ যখন ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগোতে চাইছে, তখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদেরও তাদের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তা-সবকিছুর ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি করবে। সময় এসেছে সমন্বিত, নবায়নযোগ্য-অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার, যাতে দেশের জ্বালানি খাত সত্যিকারের টেকসই ও ঝুঁকি-সহনীয় পথে এগোতে পারে।
