রমজানে সীমিত ক্লাস ও ছুটি কমানো-শৃঙ্খলিত পাঠদানে ভারসাম্যের প্রয়োজন

নি¤œমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা প্রকাশের পর যে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের শিক্ষা বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আনে। নতুন তালিকায় ১২ দিন ছুটি কমানো ও রমজানের অর্ধেক সময় ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের একাংশের আপত্তি তৈরি করলেও শিক্ষা প্রশাসনের যুক্তি-সিলেবাস শেষ করা ও কার্যকর পাঠদানের দিন বাড়ানো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার-শনিবার মিলিয়ে বছরে ১০৪ দিনের সাপ্তাহিক বন্ধের সঙ্গে তালিকাভুক্ত ৬৪ দিন যোগ হলে মোট ছুটি দাঁড়ায় ১৬৮ দিন। পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ ৩৬ দিন, বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা, বই বিতরণ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে আরও কিছু দিন ব্যয় হওয়ায় বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ক্লাসের দিন ১৫০ দিনের নিচে নেমে আসে। এমন প্রেক্ষাপটে ছুটি পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ অযৌক্তিক নয়-বিশেষ করে পোস্ট-প্যান্ডেমিক শিক্ষাঘাটতি ও শেখার ঘাটতি পূরণের চাপে। তবে রমজানে ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক উদ্বেগও গুরুত্বহীন নয়। গরম আবহাওয়া, দীর্ঘ উপবাস ও সময়সূচির পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শিক্ষকদের কর্মদক্ষতায় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, শিক্ষা প্রশাসনের প্রত্যাশা-সীমিত পরিসরে ও পরিকল্পিতভাবে ক্লাস চালু থাকলে পাঠ্যসূচি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ফল মিলতে পারে। এখানে মূল প্রশ্নটি ছুটি বেশি না কম- তা নয়; বরং, সিদ্ধান্তটি কতটা বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সিলেবাস পূরণ কেবল ক্যালেন্ডার সংকোচনের মাধ্যমে সম্ভব হয় না; প্রয়োজন মানসম্মত পাঠদান, যুক্তিসঙ্গত মূল্যায়ন, এবং সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা। রমজানে সীমিত ক্লাস চালুর ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত সময়ের ক্লাস ও নমনীয় সময়সূচি করা যেতে পারে। এছাড়াও ভারী মূল্যায়ন বা চাপমুখী পাঠ এড়িয়ে পুনরাবৃত্তি ও সহায়ক শেখায় গুরুত্ব। পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবক-প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত আলোচনার সুযোগ তৈরি। এ ছাড়া ছুটি কমানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের ভিড়, সহায়ক শিক্ষাবিষয়ক অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ-এসব ক্ষেত্রেও উদ্যোগ না নিলে কাক্সিক্ষত সাফল্য মিলবে না। জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা আজ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে নীতিনির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রয়োজন সংবেদনশীলতা ও অংশীজনের আস্থা। শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে শৃঙ্খলিত করা সময়ের দাবি-তবে তা হতে হবে যুক্তিসঙ্গত, মানবিক ও বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রমজানসহ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান রেখে শেখার দিন বাড়ানোর এই প্রচেষ্টা যেন শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর শেখার মানোন্নয়নেই কেন্দ্রীভূত থাকে-সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
