নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে প্রয়োজন দায়বদ্ধতা ও কার্যকর নজরদারি

বিদায়ী বছরটিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের দিক থেকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে ধর্ষণ, দলগত ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-নির্যাতনের শিকারদের বড় অংশই কন্যাশিশু। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতাও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামাজিক ও মানসিক সংকটের বহুমাত্রিক প্রতিফলন। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, অপরাধ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত নজরদারি, দ্রুত বিচার ও ভিকটিম-সহায়ক আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হলেও সামগ্রিকভাবে বিচার-বিলম্ব ও মামলার দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর ফলে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতা-উভয়ই কেবল অপরাধ নয়, সামাজিক ক্ষমতার অসমতা, লিঙ্গ-বৈষম্য ও সহিংস সংস্কৃতির প্রতিফলন। পরিসংখ্যান বলছে, পারিবারিক সহিংসতার কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে যৌতুক, দাম্পত্য কলহ, মানসিক চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতার মতো বিষয়। এসব ইঙ্গিত করে যে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক সামাজিক উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সচেতন হওয়া জরুরি। শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তদন্ত, সাক্ষ্য-সুরক্ষা এবং ট্রমা-সংবেদনশীল বিচারপ্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দ্রুত বিচার তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক এবং ন্যায়সঙ্গত হবে। এছাড়াও পরিবার ও শিক্ষা-পর্যায়ে সচেতনতা, পরামর্শসেবা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে হবে-বিশেষত কিশোর-কিশোরী ও অভিভাবকদের জন্য। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো দরকার, যাতে অপরাধ সংঘটনের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি শনাক্ত করা যায়। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো একক খাতের দায় নয়; এটি রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ-সব পক্ষের যৌথ দায়িত্ব। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি পুনরাবৃত্তি রোধে নীতি-সহায়তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা ও আইনি সহায়তা প্রাপ্তিকে সহজ করতে হবে। বিদায়ী বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সংখ্যা নয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের নিরাপত্তা-বোধ। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা রোধকে উন্নয়ন ও মানবাধিকার-অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখতে হবে। নিরাপদ পরিবার ও সহনশীল সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতেই হবে-এখনই, টেকসই ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে।
