সম্পাদকীয়

টিকে থাকার লড়াইয়ে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি

ডাম্পিং সংকট ও বস্ত্রশিল্প

দেশের বস্ত্রশিল্প দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতে এক ধরনের বিপর্যস্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ থেকে ২০ মাসে ৫০টি বস্ত্রকল কার্যক্রম বন্ধ করেছে এবং আরও ৫০টি মিল সীমিত সক্ষমতায় চলছে। ফলে দুই লাখের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন-যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দৃষ্টিকণ থেকেও উদ্বেগজনক। বিটিএমএর মতে, ভারত থেকে কম দামে সুতা আমদানির ফলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। সংগঠনটির সভাপতি জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ডাম্পিং মূল্যে সুতা রপ্তানি করছে এবং এর প্রভাবে স্থানীয় মিলগুলোতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতি সহায়তা, জ্বালানি সুবিধা ও নগদ প্রণোদনা বিশ^বাজারে তাদের সুতাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে-এ অভিযোগও সভায় তোলা হয়। তবে এখানে ডাম্পিং হয়েছে কি না-তা যাচাইয়ের জন্য প্রমাণভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক বিষয়; কিন্তু ডাম্পিং হলে বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার নীতির আওতায় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও কেবল আমদানি নিয়ন্ত্রণ বা প্রণোদনা বৃদ্ধি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নাও পাওয়া যেতে পারে। প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং দক্ষতা উন্নয়ন-এসব ক্ষেত্রেও সংস্কার প্রয়োজন। বিটিএমএর দাবি অনুযায়ী সুতা রপ্তানিতে নগদ সহায়তা, ইডিএফ তহবিলের আকার বৃদ্ধি, সুদহার ও ঋণ পরিশোধে রেয়াত-এসব প্রস্তাব স্বল্পমেয়াদে শিল্পকে স্বস্তি দিতে পারে। তবে নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হবে-প্রণোদনা সুষমভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না, শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহার টেকসই উন্নয়নে সহায়ক কি না। একই সঙ্গে বাজার বহুমুখীকরণ, ম্যান-মেড ফাইবার ও উচ্চমূল্য সংযোজিত সুতা উৎপাদনের দিকেও মনোযোগ দেওয়া উচিত। প্রতিযোগিতামূলক বিশ^বাজারে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ শিল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ-এ মন্তব্যও অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতা, সময়োপযোগী উদ্যোগ এবং শিল্প-ব্যবসা-শ্রমিক-তিন পক্ষের সমন্বিত সংলাপ জরুরি। অন্যদিকে, আমদানিনির্ভর পোশাক রপ্তানিকারকদের মতামত ও ভোক্তা স্বার্থকেও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। দেশের বস্ত্রশিল্প কেবল একটি খাত নয়; এটি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও শিল্পায়নের ধারাবাহিকতার সাথে জড়িত। তাই স্বল্পমেয়াদি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন প্রয়োজন-যাতে শিল্প টিকে থাকে, শ্রমিকেরা সুরক্ষিত থাকে এবং প্রতিযোগিতা হয় ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button