সম্পাদকীয়

রেমিট্যান্সে রেকর্ড প্রবাহ: স্থিতিশীলতায় সম্ভাবনা ও কিছু সতর্কতা

২০২৫ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স নতুন রেকর্ড গড়েছে। একক বছরে প্রথমবারের মতো ৩২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করা শুধু পরিসংখ্যানগত অর্জনই নয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোর ক্ষেত্রেও এটি বড় সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। সদ্যবিদায়ী বছরে ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং বছরের শেষ পাঁচ মাসে উচ্চ প্রবাহ প্রমাণ করে যে ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর আস্থা বেড়েছে, একই সঙ্গে অবৈধ বাজারের সংকোচন প্রবণতাও কার্যকর হয়েছে। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ ডলারের বিনিময়হারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে, যার ফলে রিজার্ভ দ্রুত পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কর্তৃক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রির পর গ্রস রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সংকেত। এতে আমদানি সক্ষমতা ও নীতি-অভিযোজনের পরিসর উভয়ই কিছুটা সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এই অর্জনের সঙ্গে কিছু নীতিগত প্রশ্নও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ অনুসারে উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ যদি ভোগব্যয়ে বেশি মনোনিবেশ করে, তবে তা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে-এই বৈদেশিক আয়কে সঞ্চয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে প্রবাহিত করা। রেমিট্যান্সের একটি অংশ যেন আর্থিক খাতে আনুষ্ঠানিক সঞ্চয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগে যায়-এ জন্য সুস্পষ্ট প্রণোদনা কাঠামো ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নীতি জরুরি। আরেকটি কাঠামোগত ইস্যু হলো প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা-চিত্র। বর্তমানে রেমিট্যান্স পাঠানো জনশক্তির বড় অংশ অদক্ষ কর্মী। দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, এবং নতুন শ্রমবাজারে বৈধ ও সুরক্ষিত চ্যানেল সম্প্রসারণ করলে রেমিট্যান্স আরও বহুগুণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি, কর্মসংস্থান চুক্তির মানোন্নয়ন এবং রেমিট্যান্স প্রেরণে আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা-এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করবে। পাশাপাশি অবৈধ হুন্ডি কমাতে নিয়মিত নজরদারি ও ন্যায়সঙ্গত বিনিময়হার নীতি বজায় রাখা প্রয়োজন। ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতিযোগিতামূলক হার, দ্রুত সেবা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসীদের আস্থার এই ধারা আরও সুদৃঢ় হবে। রেমিট্যান্স আজ শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস নয়-এটি সামাজিক সুরক্ষা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি প্রধান স্তম্ভ। তাই সাময়িক প্রবৃদ্ধির সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তিতে রূপান্তর করতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও নীতি-সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী করণীয়।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button