সম্পাদকীয়

শহর পেরিয়ে এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট

ডেঙ্গুর বিস্তার

বছরের শেষ দিন পর্যন্ত প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্বেগের নতুন মাত্রা তুলে ধরে। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ দুই হাজারের বেশি; এর মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ রোগী ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত পাঁচ বছরের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়-ডেঙ্গু আর কেবল নগরকেন্দ্রিক সংক্রমণ নয়, এটি এখন সারাদেশব্যাপী এক বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, মৃত্যুর হার এখনও ঢাকায় বেশি হলেও সামগ্রিক আক্রান্তের বড় অংশ এখন গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে। ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি-যা শিক্ষা ও কর্মক্ষম জনশক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ঢাকার বাইরের রোগীর হার আরও বেড়েছে-এটাই ইঙ্গিত করে যে, সংক্রমণ এখন নতুন ভৌগোলিক পরিসরে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ থেকে দুইটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাস, লঞ্চ ও ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে এডিস মশা শহর থেকে গ্রামে বিস্তার লাভ করছে। দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে দ্রুত নগরায়ণ ও অনিয়মিত পানি সরবরাহের কারণে মানুষ ঘরে-বাইরে বিভিন্ন পাত্রে পানি সংরক্ষণ করছেন-যা এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত আবাস তৈরি করছে। অর্থাৎ পরিবেশগত বাস্তবতা বদলালেও মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সে তুলনায় আধুনিক বা বিকেন্দ্রীভূত হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে-ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে এখনও কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বাজেট, জনবল ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি না থাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বাস্তবভিত্তিকভাবে বিস্তৃত হয়নি। ফলে সংক্রমণ যখন নতুন এলাকায় প্রবেশ করছে, তখন সেখানকার মানুষ চিকিৎসা, সচেতনতা ও প্রতিরোধ-সব ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। ডেঙ্গু মোকাবিলা কেবল মশা নিধন অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়-এটি একটি সমন্বিত শাসনব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য খাত, নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। পানিসংরক্ষণ পাত্র ব্যবহারে নির্দেশিকা, নির্মাণকাজে পানি জমা রোধ, সারা বছর পর্যবেক্ষণ ও ডেটা-ভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি-এসব উদ্যোগকে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ করতে হবে। এখনই যদি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী কর্মসূচি, প্রশিক্ষিত জনবল ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত না করা যায়, তবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে-এমন সতর্কতা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেই আসছে। ডেঙ্গু আজ মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। নীতিনির্ধারক, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক-সবার সম্মিলিত দায়িত্বই এখন একটিই: প্রতিরোধের জানালা খোলা থাকা অবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। নইলে ডেঙ্গু আরও বিস্তৃত ও ব্যয়বহুল সংকটে রূপ নিতে পারে-যার মূল্য দিতে হবে জাতির স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকেই।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button