সম্পাদকীয়

অর্থনীতির সামগ্রিক স্থবিরতার প্রতিচ্ছবি

নির্মাণখাতে সংকট

নির্মাণশিল্পের সংকট আজ আর শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক স্থবিরতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের উন্নয়নযাত্রায় এই খাত দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মেগাপ্রকল্পের অগ্রগতি থমকে যাওয়া, নতুন বিনিয়োগে অনীহা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপ মিলিয়ে নির্মাণশিল্প কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। বড় প্রকল্প থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র অবকাঠামো- সবখানেই একই চিত্র। সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ইতিহাসের সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে আসা এই সংকটের গভীরতাকে স্পষ্ট করে। অর্থায়নের অনিশ্চয়তা এবং কঠোর মুদ্রানীতি নির্মাণশিল্পকে আরও বিপদে ফেলেছে। উচ্চ সুদহার ও সংকোচনমূলক নীতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে এসে ঠেকেছে। উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন বা শিল্প সম্প্রসারণের ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছেন। বাজারে নির্মাণসামগ্রীর দাম কমলেও চাহিদার অভাবে ব্যবসায়ীরা হতাশ। একসময় রড, সিমেন্ট ও ইটের দাম নিয়ে হাহাকার থাকলেও এখন ক্রেতাশূন্য বাজারে বিক্রেতাদের হাহাকারই প্রকট হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো কর্মসংস্থানের সংকট। নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েক শ’ শিল্প এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা আজ বিপন্ন। মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বিনিয়োগকারীরা নতুন ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি তিনটি পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন ব্যয়ে শৃঙ্খলা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে লক্ষ্যভিত্তিক নীতি সহায়তা দিতে হবে। স্থবিরতার দীর্ঘ ছায়া কাটাতে হলে এখনই সাহসী নীতি পদক্ষেপ এবং কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। অন্যথায় নির্মাণশিল্পের সংকট সামগ্রিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার ফাঁদে ফেলে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে বিপন্ন করবে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button