ইটভাটার মালিকদের লাগাম টানবে কে?

পাড় কাটার নামে পরিবেশ ধ্বংস
বরিশালের আড়িয়ালখাঁ ও কীর্তনখোলা নদীর তীর ধরে যে ভয়াবহ পরিবেশ ও ভূমি ধ্বংসের চিত্র উঠে এসেছে, তা নিছক একটি ইটভাটার দোষে সীমাবদ্ধ নয়-এটি গোটা একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও অবহেলার ফল। মাটি কেটে নেওয়ার পরিণতি যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তা নদীভাঙনে ঘর হারানো পরিবারগুলোর চেয়ে ভালো আর কে জানে? তবুও নদীর পাড়েই দিনের পর দিন চলে মাটি কাটার অবৈধ উৎসব-কখনো দিনে, কখনো গভীর রাতে। সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যে থেকে জানা গেছে, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নে ‘মেসার্স হাওলাদার ব্রিকস’ নামের একটি ইটভাটার জন্য আড়িয়ালখাঁ নদীর পাড় কেটে শ্রমিকরা মাটি সংগ্রহ করছেন। তাদের দাবি-তারা শুধু নির্দেশ পালন করছেন, জমির মালিকানা নিয়ে তাদের কিছুই জানা নেই। আর নির্দেশদাতা? ইটভাটার মালিক আলাউদ্দিন বিপ্লব, যিনি স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবারে সম্পৃক্ত। সাংবাদিকদের একাধিকবার যোগাযোগের পরও তিনি এ বিষয়ে মুখ খোলেননি, এমনকি ফোন রিসিভ করতেও অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। নদীঘেঁষা এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, শুধুমাত্র একটি নয়, অন্তত সাতটি ইটভাটা এই একই নদীর পাড় কেটে ইট তৈরির জন্য মাটি সংগ্রহ করছে। কেউ হয়তো নিজের জমির মাটি বিক্রি করেছেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই জোরপূর্বক মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবারই এর ফলাফল এক- নদীভাঙন, পরিবেশ বিপর্যয়, কৃষিজমি ও বসতভিটা বিলীন, আর প্রশাসনের নিস্পৃহতা। স্থানীয় প্রশাসন যে এই ঘটনাগুলো জানে না, তা নয়। বরং ভুক্তভোগীরা বারবার জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। কীর্তনখোলা নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে নেওয়ার বিষয়ে যখন ট্রলারভর্তি মাটি চোখের সামনে, তখনও সংশ্লিষ্ট ইটভাটার মালিক অস্বীকার করেন সত্যতা। অথচ তার শ্রমিকরাই স্পষ্টভাবে বলছেন, তারা প্রতিবছর এখান থেকে মাটি কেটে থাকেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, পরিবেশ রক্ষার নামে দেশে নানা নীতি, আইন ও সংস্থা থাকলেও, তার বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। ইটভাটা পরিচালনা, বিশেষ করে মাটি সংগ্রহের বিষয়ে কঠোর নিয়মাবলি রয়েছে। নদীর তীর থেকে মাটি কাটা শুধু পরিবেশ আইনের লঙ্ঘনই নয়, এটি একটি ফৌজদারি অপরাধও। তারপরও বছরের পর বছর এইসব অবৈধ কর্মকা- চলতে থাকা আমাদের নীতিনির্ধারকদের দায়মুক্ত করে না। প্রশ্ন ওঠে-এই দুর্বৃত্তপনা বন্ধে কে এগিয়ে আসবে? জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোথায় কোথায় মাটি কাটা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু খতিয়ে দেখা আর মাঠপর্যায়ে কার্যকর অভিযান-এই দুইয়ের ফারাক বিশাল। নদীর তীর থেকে মাটি কাটা বন্ধ করতে হবে এখনই-এটি আর বিলম্ব করার বিষয় নয়। উন্নয়নের কথা বলে যদি আমরা নদী ধ্বংসের লাইসেন্স দিই, তাহলে সেই উন্নয়ন একেবারেই আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াবে।
