সম্পাদকীয়

অর্থনৈতিক সংকট আড়ালে নয়

রাজনৈতিক অস্থিরতা

বাংলাদেশের জনজীবন এখন রাজনৈতিক উত্তেজনায় আচ্ছন্ন। নির্বাচন, গণভোট, বিচার সংস্কার- সবই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু এই কোলাহলের আড়ালে যে সংকট নীরবে গভীর হচ্ছে, তা হলো অর্থনীতির প্রাণশক্তি রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক পতন। গত কয়েক মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। কার্যাদেশ কমে গেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়ছে, আমদানি সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে, কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ছে। অথচ রাজনৈতিক বিতর্কে এই সংকটের প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। কারণগুলো বহুমুখী। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অভ্যন্তরীণভাবে আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট করছে। অনেক ক্রেতা নতুন সরকারের অপেক্ষায় অর্ডার স্থগিত রেখেছেন। ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উদ্যোক্তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়ছেন। এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে কারণ বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে। শুল্কমুক্ত সুবিধা ধীরে ধীরে উঠে যাবে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক পতন প্রমাণ করছে, আমরা সেই প্রস্তুতিতে পিছিয়ে আছি। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন- পরমিট্যান্স কিছুটা বাড়লেও রপ্তানি আয় কমে গেলে আমদানি বাণিজ্য ব্যাহত হবে, শিল্প উৎপাদন কমবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও টেকসই থাকবে না। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা একে অপরকে আরও জটিল করে তুলবে। এখন প্রশ্ন হলো, করণীয় কী? প্রথমত, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যবসাবান্ধব নীতি সহায়তা জোরদার করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কারণ, স্থিতিশীল পরিবেশ ছাড়া কোনো বিনিয়োগ বা রপ্তানি কার্যক্রম টেকসই হতে পারে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, রপ্তানি আয় শুধু ব্যবসায়ীদের লাভ নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান পর্যন্ত সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজনৈতিক আলোচনার ভিড়ে অর্থনৈতিক সংকটকে আড়ালে রাখা যাবে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কত দ্রুত রপ্তানি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারি তার ওপর। এখনই যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সামনে আরও বড় ধাক্কা আসবে। রাজনৈতিক উত্তেজনার আড়ালে অর্থনৈতিক পতনকে উপেক্ষা করলে তা আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রাকে অন্ধকারে ঠেলে দেবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button