সম্পাদকীয়

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অপহরণের সংখ্যা

আইনশৃঙ্খলার গভীর সংকেত

দেশে অপহরণের সংখ্যা যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তা এখন আর পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়-এটি একটি স্পষ্ট সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকেত। পুলিশ সদরদপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে দেশে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১০২টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ। একই সময়ে খুন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। এই চিত্র সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। নতুন বছরে ধারাবাহিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকা- জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য গুলি, পিটিয়ে হত্যা ও অপরাধীদের বেপরোয়া আচরণ দেখাচ্ছে-অপরাধ দমনে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের পরিস্থিতি রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ায়। সরকার ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ চালু করে ২৪ দিনে ১৫ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এই অভিযান আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবতা হলো-অভিযানের মধ্যেও খুন, গুলির ঘটনা থামেনি। এতে প্রশ্ন উঠছে, কেবল গ্রেপ্তারসংখ্যা বাড়ানোই কি অপরাধ দমনের যথেষ্ট সূচক, নাকি অপরাধের মূল নেটওয়ার্ক ও পৃষ্ঠপোষকদের স্পর্শ করা যাচ্ছে না। অপহরণ বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়-সংগঠিত অপরাধচক্রের সক্রিয়তা, মাদক কারবারকে ঘিরে সহিংসতা, পেশাদার ভাড়াটে খুনির উপস্থিতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের অপরাধী গোষ্ঠীর পুনরুত্থান। জুরাইনে সিএনজি চালক হত্যার ঘটনা বা রাজধানীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের গুলি করে হত্যা-এসবই দেখায় অপরাধীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভয় কম পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখার নির্দেশ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্দেশ বাস্তবায়নে কেবল অভিযাননির্ভর কৌশল নয়, প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার, অস্ত্র ও মাদকের উৎস বন্ধ করা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী আশ্রয় ভাঙা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কেবল নিরাপত্তা নয়, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। মানুষ যদি রাস্তায়, বাসায় বা ভোটকেন্দ্রে নিরাপদ বোধ না করে, তবে উন্নয়ন ও নির্বাচন-উভয়ই অর্থহীন হয়ে পড়ে। অপরাধ দমনে দৃশ্যমান সাফল্য আনতে হলে রাষ্ট্রকে এখন পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button