চ্যালেঞ্জের মাঝেও আশাবাদ

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস
বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নানা চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পথ চলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের সংকট এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে শুল্কসংক্রান্ত ঝুঁকি- সব মিলিয়ে প্রবৃদ্ধির গতি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবুও বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস প্রতিবেদনে যে আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৬ শতাংশ হলেও আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে ৬.১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এই পূর্বাভাস কেবল সংখ্যার খেলা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল এক বাস্তব সম্ভাবনা। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যদি রাজনৈতিক স্থিতি ফিরে আসে, তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে। অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। প্রতিবেদনের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো নতুন সরকারের কাছ থেকে কাঠামোগত সংস্কারের প্রত্যাশা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং শিল্প সহায়ক নীতিমালা বাস্তবায়ন- এসব পদক্ষেপ যদি দ্রুত নেওয়া যায়, তবে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে এসব সংস্কার অপরিহার্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যও আশার আলো দেখাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৪ শতাংশে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ২.৫৮ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ধীরে হলেও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা পিছিয়ে নেই। বরং সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে দেশটি আবারও প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পাল্টা শুল্ক আরোপের ঝুঁকি রপ্তানি খাতকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে আগামী সরকারের প্রধান দায়িত্ব। যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সংস্কার শুরু করা না যায়, তবে বিশ্বব্যাংকের আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশ অতীতে বহুবার প্রমাণ করেছে, সঠিক নীতি ও নেতৃত্ব পেলে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। এবারও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থিতি ফিরলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি আবারও শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস আমাদের সামনে যে আশার আলো দেখাচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব- যদি আমরা এখনই সঠিক পথে হাঁটি। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা হোক। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার কেবল সংখ্যার উন্নতি নয়, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর।
