বাদুড় বাহিত নতুন ভাইরাস ও জনস্বাস্থ্যের সতর্কবার্তা

দেশে বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো নতুন এক ভাইরাস-রিওভাইরাস (অর্থোরিওভাইরাস)-শনাক্ত হওয়ার খবর জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয় ও আইইডিসিআরের যৌথ গবেষণায় পাওয়া এই তথ্য শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, নজরদারি ব্যবস্থা ও প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতির সক্ষমতাকে নতুন করে পর্যালোচনার ইঙ্গিত দেয়। গবেষণায় পাঁচজন মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যাদের একজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের উপসর্গ নিপাহ ভাইরাসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও পরীক্ষায় নিপাহ শনাক্ত হয়নি-এ বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন নিপাহ ভাইরাসকে কেন্দ্র করে যেসব সতর্কতা ও নজরদারি চালু ছিল, এই গবেষণা দেখিয়ে দিল যে বাদুড়বাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বিস্তৃত এবং বহুমাত্রিক। রিওভাইরাস নতুন নয়; বিশে^র বিভিন্ন দেশে এর অস্তিত্ব আগেও ধরা পড়েছে। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ মিলল যে এটি মানুষের শ^াসতন্ত্র ও ¯œায়ুতন্ত্রে গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে পারে। আধুনিক ভিরক্যাপসেক-ভার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় সম্পূর্ণ ভাইরাস জিনোম বিশ্লেষণ এবং ভাইরাস কালচার সফল হওয়া দেশের গবেষণা সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে। তবে গবেষণার ফলাফল কিছু বাস্তব প্রশ্নও সামনে এনেছে। আক্রান্ত পাঁচজনই অসুস্থ হওয়ার আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন-যা নিপাহ সংক্রমণের ক্ষেত্রেও পরিচিত ঝুঁকি। অর্থাৎ, একই পরিবেশ ও আচরণ একাধিক ভাইরাস সংক্রমণের পথ তৈরি করছে। এতে বোঝা যায়, কেবল একটি নির্দিষ্ট রোগকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে তা যথেষ্ট নয়; বরং সামগ্রিকভাবে বাদুড়বাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো-গবেষকরা মনে করছেন, দেশে হয়তো মৃদু উপসর্গের অনেক সংক্রমণ শনাক্তের বাইরে রয়ে গেছে। যদি তা সত্য হয়, তবে বর্তমান নজরদারি ব্যবস্থায় ফাঁক থেকে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকায় রোগ শনাক্ত ও প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। এই প্রেক্ষাপটে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কাঁচা খেজুরের রস পান থেকে বিরত থাকা, আংশিক খাওয়া বা পোকায় কাটা ফল না খাওয়া এবং সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে, ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার আলোকে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ-এই তিনের সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। রিওভাইরাস শনাক্তের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও তত জটিল হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতিই পারে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার পথ দেখাতে।
