গণমাধ্যমের ঐক্য জরুরি

গণতন্ত্রের সংকট
গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা এবং পেশাগত বিভাজন আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনকে ঘিরে হুমকি-সব মিলিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সাংবাদিক সমাজের ভেতরেই বিভাজন তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ আক্রান্ত হলে অন্য পক্ষ নীরব থাকে, ফলে পুরো পেশাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই নীরবতা আসলে আক্রমণকারীদের আরও সাহসী করে তোলে এবং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সংকুচিত করে। স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। সরকারের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী প্রায়ই শাসককে প্রশংসার মোহজালে আবদ্ধ রাখে। সেখানে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমই একমাত্র শক্তি, যা জনদুর্ভোগ ও রাষ্ট্রীয় অসংগতির কথা নির্ভীকভাবে তুলে ধরে। তাই সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা মানে সরকার নিজেকে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের অধিকার নয়, এটি সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার। জনগণকে তথ্য থেকে বঞ্চিত করা মানে তাদের গণতান্ত্রিক ক্ষমতাকে দুর্বল করা। তাই সরকার পরিবর্তন হলেই সমস্যার সমাধান হবে-এমন ধারণা বিভ্রান্তিকর। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাংবাদিক সমাজের ঐক্য অপরিহার্য। ঐক্যের ডাক আজ আর কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি সাংবাদিকতার অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত। একজনের ওপর আঘাত আসলে সেটি সবার ওপর আঘাত-এই উপলব্ধি তৈরি না হলে সাংবাদিকতা নৈতিক শক্তি অর্জন করতে পারবে না। দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদার স্বার্থে গণমাধ্যমকে দল-গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে সত্য, ন্যায় ও পেশাগত সততার পক্ষে একত্র হতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, গণমাধ্যমের ঐক্য ও স্বাধীনতা রক্ষা করেই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা যায়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে গণতন্ত্রের উত্তরণে সাংবাদিকদের ঐক্য ছিল অন্যতম চালিকা শক্তি। আফ্রিকার অনেক দেশে আবার সাংবাদিকদের বিভাজন গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজকে এই শিক্ষা নিতে হবে-ঐক্য ছাড়া গণমাধ্যম শক্তি অর্জন করতে পারে না, আর গণমাধ্যম শক্তি ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।
