সম্পাদকীয়

ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারই এখন সময়ের দাবি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে আলোচনা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, তা কেবল ক্ষমতার পালাবদলেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত সাম্প্রতিক সংলাপে সেই প্রত্যাশারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে। নাগরিক সমাজের এই অবস্থান দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও একটি টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। নির্বাচনী ব্যবস্থার দুর্বলতা, ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহির অভাব দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হয়ে আছে। সুজনের বক্তব্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে এসব দুর্বলতার সুযোগে যে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা গড়ে উঠেছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান তার বিরুদ্ধে জনগণের এক ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া। এই প্রেক্ষাপটে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন-এই তিন অগ্রাধিকারের কথা সামনে আসা স্বাভাবিক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলো এবং সেখান থেকে উদ্ভূত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’কে নাগরিক সমাজ একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে এই সনদ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার চাওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে-নির্বাচন কি কেবল ক্ষমতা দখলের মাধ্যম হবে, নাকি রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ? সুজন প্রস্তাবিত ১৫ দফা সংস্কার দাবির মূল সুর হলো জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়া। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে মানবাধিকার নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংহত করা, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা রক্ষা-এসব দাবি নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি বারবার গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের মতো কাঠামোগত প্রস্তাব নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও সামনে আনে। ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদের কার্যকর নজরদারি, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন-এই বিষয়গুলো গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পররাষ্ট্রনীতির মতো ক্ষেত্রগুলোকে সংস্কার আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা প্রমাণ করে যে নাগরিক প্রত্যাশা কেবল রাজনৈতিক কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার দিকেই নিবদ্ধ। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো-নাগরিক সমাজ এখন অস্পষ্ট আশ^াসে সন্তুষ্ট নয়। তারা জানতে চায় সংস্কারের পথনকশা, সময়সীমা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার সেই পরীক্ষার প্রথম ধাপ। এই নির্বাচন গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে বাস্তব রাষ্ট্রীয় রূপ দেওয়ার সুযোগ নাকি পুরনো ধারার পুনরাবৃত্তি-তা অনেকটাই নির্ভর করবে ইশতেহারে সংস্কার প্রতিশ্রুতির স্পষ্টতা ও আন্তরিকতার ওপর।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button