সম্পাদকীয়

সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা জোরদার: সুফল ও সতর্কতার প্রশ্ন

সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অর্থ বিভাগের পূর্ব অনুমোদন বাধ্যতামূলক করে ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের আর্থিক ক্ষমতা আদেশ বাতিল করে নতুন সমন্বিত অফিস স্মারক জারির মাধ্যমে সরকার কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণকে আরও সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালার সংশোধনের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ সময়োপযোগী বলেই মনে হয়। নতুন আদেশে পদ সৃষ্টি ও বিলুপ্তকরণ, বেতনক্রম ও পদমর্যাদা পরিবর্তন, যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়, আউটসোর্সিং, সাময়িক শ্রমিক নিয়োগ থেকে শুরু করে বাজেট পুনঃউপযোজন, সম্মানী প্রদান, বিদেশ সফরের ব্যয় এবং অনাদেয় ক্ষতি অবলোপন-সব ক্ষেত্রেই অর্থ বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রোধের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক দায় সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও আগেভাগে যাচাই করা সম্ভব হবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, সরকারি কর্মকর্তাদের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘নিজের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয়ের মতো সতর্কতা’ অবলম্বনের নির্দেশনা। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, বরং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় মানসিকতা ও সংস্কৃতি বদলের আহ্বান। যদি এই দর্শন বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে অপচয়, অযৌক্তিক সম্মানী, বিধিবহির্ভূত ব্যয় এবং গাফিলতিজনিত ক্ষতির প্রবণতা কমতে পারে। তবে এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতিরিক্ত অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রশাসনিক কাজের গতি শ্লথ করতে পারে-বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোতে, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, জনবল সংকট বা জরুরি সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই অনুমোদন প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল, সময়বদ্ধ ও স্বচ্ছ করা না গেলে কাক্সিক্ষত সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ যেন দায়িত্ব বিকেন্দ্রীকরণের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর বাস্তব প্রয়োজন ও সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। সব মিলিয়ে, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় এই নতুন কাঠামো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রয়োগের দক্ষতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক নজরদারির ওপর। শৃঙ্খলা আর গতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button