সম্পাদকীয়

সুতা আমদানিতে শুল্ক ও পোশাকশিল্পের ঝুঁকি

সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত বা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ ঘিরে তৈরি পোশাকশিল্পে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। রপ্তানিনির্ভর এই খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস, কর্মসংস্থানের বড় ভরকেন্দ্র এবং অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এমন বাস্তবতায় সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত যদি যথাযথ আলোচনা ও প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই কার্যকর হয়, তবে তার অভিঘাত হবে বহুমাত্রিক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব এসেছে মূলত স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর সুরক্ষার যুক্তিতে। স্থানীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান রক্ষার এই যুক্তি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হলো-একটি শিল্পকে রক্ষা করতে গিয়ে আরেকটি বৃহত্তর শিল্পকে ঝুঁকিতে ফেলা কতটা যুক্তিসংগত? পোশাক রপ্তানিকারকেরাই স্থানীয় স্পিনিং মিলের প্রধান ক্রেতা। তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বস্ত্রশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পোশাকশিল্পের সংগঠনগুলোর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট-মূল সমস্যা দামের ব্যবধান। আমদানিকৃত সুতার তুলনায় স্থানীয় সুতা সামান্য বেশি দামে হলে তা মেনে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু ব্যবধান যদি ৩০ থেকে ৬০ সেন্টে পৌঁছে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে সুপারিশের খবরে কিছু বস্ত্রকলের দাম বাড়ানো এবং বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পরিস্থিতির সংবেদনশীলতাই তুলে ধরে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। পোশাকশিল্পের সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ট্যারিফ কমিশনের আলোচনায় তাদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এমন বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে হলে শিল্পখাতগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। বিশ^বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আইনি ও বাণিজ্যিক জটিলতাও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এমন এক সময় দিয়ে যাচ্ছে, যখন বৈশি^ক মন্দা, ক্রেতাদের মূল্যচাপ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে লাভের মার্জিন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলবে। স্থানীয় বস্ত্র ও পোশাক-দুই শিল্পই পরস্পরনির্ভর। একটির ক্ষতি অন্যটিকেও দুর্বল করবে। সুতরাং প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান। শুল্ক আরোপই একমাত্র পথ-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, প্রযুক্তি উন্নয়ন, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে টেকসই পথ। তা না হলে সুতা আমদানির শুল্ক সুবিধা বাতিল পোশাকশিল্পের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে, যার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে পুরো অর্থনীতিকেই।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button