এআই অপতথ্য ও নির্বাচনী ঝুঁকি

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ভিডিও, ছবি ও ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে যে মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসনের কন্যা জাইমা রহমানের নামে ছড়ানো একটি এআই-নির্মিত ভিডিও সাধারণ মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার বাস্তব চিত্রই তুলে ধরেছে। হাজারো মানুষ ভিডিওটি সত্য ভেবে ব্যক্তিগত তথ্য দিয়েছেন-যা ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমাবদ্ধতা ও অপতথ্যের ভয়াবহ ক্ষমতা স্পষ্ট করে। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সাধারণ ভোটার, নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু চরিত্র ব্যবহার করে এআই ভিডিও বানিয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি সংবাদপাঠকের ভিডিও বিকৃত করে নির্বাচন বাতিলের মিথ্যা দাবি প্রচার করা হচ্ছে। ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রচারিত অপতথ্যের উল্লেখযোগ্য অংশই এআই দিয়ে তৈরি-এবং নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, এর বিস্তার তত বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বিপুলসংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখনো তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেননি। সামাজিক মাধ্যমে দেখা কনটেন্ট দ্রুত বিশ^াস ও শেয়ার করার প্রবণতা অপপ্রচারকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। একটি মাত্র ভুয়া ভিডিও বা ছবি অল্প সময়েই জনমত প্রভাবিত করতে পারে-যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ঝুঁকি তৈরি করে। আইনগতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ দুর্বল। নির্বাচন কমিশন এআই-নির্ভর অপপ্রচারকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বীকার করলেও এখন পর্যন্ত তাদের উদ্যোগ মূলত মনিটরিং সেল ও হটলাইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অনলাইনে অপপ্রচারের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা দ্রুত প্রতিরোধের নজির খুব কমই দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এআই অপতথ্য নির্বাচনী ফল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় কেবল প্রশাসনিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশন, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, গণমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল যাচাই ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আইনি সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বাচনের বিশ^াসযোগ্যতা রক্ষায় এখনই যদি এআই-চালিত অপতথ্যের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া না যায়, তবে এই ডিজিটাল বিভ্রান্তি ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
