সম্পাদকীয়

মাদক সংকটের বয়স কমছে, ঝুঁকি বাড়ছে

দেশে মাদক সমস্যার সর্বশেষ জাতীয় গবেষণা একটি গভীর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মাদক ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে আসে। অর্থাৎ মাদকাসক্তি এখন আর কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়; এটি ক্রমেই কিশোর ও তরুণদের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করছে। প্রায় ৮২ লাখ মাদক ব্যবহারকারীর এই চিত্র শুধু সামাজিক নয়, একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকেতও বটে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো-মাদক গ্রহণের শুরুটা হচ্ছে অত্যন্ত কম বয়সে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বন্ধুদের প্রভাবের কারণে। কৌতূহল, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক চাপ কিশোরদের মাদকের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের সামাজিক পরিবেশ, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার দায়ও সামনে আনে। কারণ, কিশোর বয়সেই যদি প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়, তবে পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণায় গাঁজাকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও কোডিনজাত কাশি সিরাপের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, যা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এতে মাদক সমস্যা কেবল অপরাধ বা নৈতিক বিচ্যুতি নয়, বরং একটি জটিল জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। ভৌগোলিক বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। ঢাকা বিভাগে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সর্বাধিক, আর বরিশালে সর্বনি¤œ। বড় শহর ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবহার ও সরবরাহের ঝুঁকি বেশি-যা আইনশৃঙ্খলা ও নজরদারির ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে। তবে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও মাদকের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ঘাটতি। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের বড় অংশ কখনোই চিকিৎসা নেয় না। যারা নেয়, তাদের অনেকেই ধারাবাহিক ও মানসম্মত সেবা পায় না। ফলে পুনরায় মাদক গ্রহণে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। কেবল ধরপাকড় বা শাস্তিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এই চক্র ভাঙতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ স্পষ্ট-মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির সমন্বিত কৌশল জরুরি। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্য করে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। নচেৎ বয়স কমার এই প্রবণতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বড় সামাজিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button