সম্পাদকীয়

নির্বাচনে তারুণ্যের উত্থান; সম্ভাবনা ও বাস্তবতার প্রশ্ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের বয়সভিত্তিক চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈধ এক হাজার ৯৮১ প্রার্থীর মধ্যে বয়স জানা এমন এক হাজার ৮৭২ জনের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি, অর্থাৎ ৩৪ শতাংশ প্রার্থী ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী। ২০০৮ সালের তুলনায় তরুণ প্রার্থীর অংশগ্রহণ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে চার কোটির বেশি নতুন তরুণ ভোটার যুক্ত হওয়ায় এবারের নির্বাচন স্বাভাবিকভাবেই ‘তারুণ্যকেন্দ্রিক’ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টি কিংবা আমজনতার দলের মতো সংগঠনগুলো বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রার্থী দিয়েছে। এনসিপির প্রায় সব প্রার্থীই তরুণ, গণঅধিকার পরিষদেও তরুণদের আধিক্য স্পষ্ট। এর বিপরীতে বড় ও পুরোনো দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী, তুলনামূলকভাবে অভিজ্ঞ ও মধ্যবয়সী প্রার্থীর ওপরই ভরসা রেখেছে। এখানেই স্পষ্ট হয় রাজনীতির দুই ধারা-একদিকে পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রতীক হিসেবে তারুণ্য, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতার যুক্তি। বড় দলগুলোর যুক্তি হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞতা অপরিহার্য। আর নতুন দলগুলোর দাবি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা ভাঙতে হলে তরুণদের সামনে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। তরুণ ভোটার ও তরুণ প্রার্থীর এই সমীকরণ নির্বাচনের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। একাংশ মনে করেন, ছাত্র-তরুণ নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা স্বভাবতই তরুণ প্রার্থীর প্রতি ঝুঁকবেন। প্রায় ১৮ বছর পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে বয়সই ভোটের একমাত্র নির্ধারক নয়। তরুণ ভোটাররাও শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ তরুণ প্রার্থী হলেও যদি সুস্পষ্ট কর্মসূচি ও বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি না থাকে, তবে শুধু বয়সের কারণে সমর্থন মিলবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। তবু এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এবারের নির্বাচনে তারুণ্যের উপস্থিতি রাজনীতিতে একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে। এটি শুধু প্রার্থী তালিকার পরিসংখ্যান নয়; বরং ভোটারদের আকাক্সক্ষা, অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। এই শক্তিকে যদি রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, বাস্তবসম্মত নীতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে তা দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যথায় তারুণ্যের এই উত্থানও আগের মতোই অপূর্ণ প্রত্যাশায় রূপ নিতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button