সম্পাদকীয়

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ভোট কেনাবেচা ঠেকাতে হবে

একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বা ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ নিয়ে গর্ব করি, তখন মুদ্রার উল্টো পিঠটি আমাদের বারবার আতঙ্কিত করে। প্রযুক্তি যেখানে মানুষের জীবনকে সহজ আর স্বচ্ছ করার কথা ছিল, সেখানে একদল অসাধু গোষ্ঠী একে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে ভোট কেনাবেচার নীলনকশা করছে কোনো কোনো দল ও প্রার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটি সংগঠিত দল ঘরে ঘরে গিয়ে বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে, যা ভোটের আগে অর্থ লেনদেনের প্রস্তুতির বড় ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতিদিন শত শত ভিডিও ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। অথচ এসব অভিযোগ ও দৃশ্যমান প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না, যা ভোটের নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদিও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতের ভোটের আগে ৪৮ ঘণ্টা সব ধরনের মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল ইসি। তবে এখনো পর্যন্ত ইসি থেকে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হলো ভোট কেনাবেচা। তবে সময়ের সাথে সাথে এই দুর্নীতির ধরণ ও কৌশল বদলেছে। এক সময় ভোট কেনাবেচা হতো নির্বাচনের আগের রাতে, চরম গোপনীয়তায়। প্রার্থীর কর্মীরা সুনির্দিষ্ট কিছু ভোটারের বাড়িতে গিয়ে হাতে নগদ টাকা গুঁজে দিত। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয় ছিল, ধরা পড়ার ঝুঁকি ছিল এবং টাকার উৎস শনাক্ত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমানের এই ‘স্মার্ট’ যুগে সেই নগদ টাকার লেনদেন চলে গেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ডিজিটাল ওয়ালেটে। এখন আর প্রার্থীর লোককে পকেটে বান্ডিল বান্ডিল টাকা নিয়ে অন্ধকার গলিপথে ঘুরতে হয় না। কেবল একটি মোবাইল নম্বর থাকলেই সেকেন্ডের মধ্যে কাজ শেষ। প্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে এই ডিজিটাল দুর্নীতি এখন এতটাই গভীরে শেকড় গেড়েছে যে, একে দূর থেকে সাধারণ কোনো ব্যক্তিগত লেনদেন বা উপহার মনে হতে পারে। এই ‘ডিজিটাল পকেট’ আজ গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় লিকেজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কোনো লেনদেন হলে তা নির্বাচনি প্রচারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না তা প্রমাণ করার কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে ভোটাররা যদি নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য, ফোন নম্বর সুরক্ষিত রাখে তাহলে এ অপরাধ কিছুটা কমতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি অর্থরিটি চাইলে টোটাল লেনদেন নিয়ন্ত্রণের নানা উপায় রয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের সামনে অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই দুয়ার দিয়ে যদি অপরাধ আর অনৈতিকতা প্রবেশ করে তবে তা রুখবার দায় রাষ্ট্রের।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button