স্বস্তির আশ^াস নাকি কাঠামোগত ব্যর্থতা

এলপিজি বাজারে সংকট
সরকার ও ব্যবসায়ীদের ধারাবাহিক আশ^াস সত্ত্বেও দেশের এলপিজি বাজারে সংকট কাটছে না। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিলিন্ডার না পাওয়া কিংবা নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনতে বাধ্য হওয়ার চিত্র এখন সাধারণ ঘটনা। বিইআরসি নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৫ টাকা হলেও বাস্তবে তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর সরাসরি চাপ পড়ছে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর, যাদের বড় অংশ রান্নার জন্য এখন এলপিজিনির্ভর। এই সংকটের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, আমদানিনির্ভরতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা-সবকিছুই জড়িত। বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৮-৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। অথচ সরকারি খাতে বাজার অংশীদারি মাত্র ১ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় বাজার পুরোপুরি বেসরকারি খাতের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিইআরসির তথ্যে দেখা যায়, লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও আমদানির সক্ষমতা সবার নেই। মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে এলপিজি আমদানি করছে। ছোট জাহাজে করে এলপিজি আমদানি করায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে। বড় জাহাজে আমদানির জন্য প্রয়োজন গভীর সমুদ্র টার্মিনাল ও উপযুক্ত অবকাঠামো, যা গড়ে তুলতে নীতিগত সহায়তার অভাব দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সরকার রমজান সামনে রেখে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। চাহিদা বাড়ার এই মৌসুমে সরবরাহ বাড়ানো গেলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৭০ দিনের ঋণ সুবিধার সিদ্ধান্তও আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব কবে বাজারে পড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। এলপিজি সংকট কেবল রমজানকেন্দ্রিক সাময়িক সমস্যা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকট। শিল্পখাতে মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহৃত হওয়ায় আবাসিক গ্রাহকরা সংকটে বেশি ভুগছেন। এর পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে এলপিজির ওপর চাপ আরও বাড়ে। এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি আমদানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নজর দিতে হবে। বড় জাহাজে আমদানির সুযোগ সৃষ্টি, বেসরকারি টার্মিনাল স্থাপনে নীতি সহায়তা, মূল্য তদারকি জোরদার এবং সরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো-এসব উদ্যোগ ছাড়া এলপিজি বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে না। নইলে ভোক্তাদের জন্য “স্বস্তির আশ^াস” কাগজেই থেকে যাবে, বাস্তবে নয়।
