সম্পাদকীয়

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দামে নিয়ন্ত্রণ: সুফল ও সতর্কতার জায়গা

দেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন করে ১৩৫টি ওষুধকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ২৯৫টি ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ তালিকাভুক্ত করা এবং এসব ওষুধের বিক্রয়মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে-এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই তালিকাভুক্ত ওষুধগুলো দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের সাধারণ রোগব্যাধির চিকিৎসায় যথেষ্ট। ফলে এর মূল্য নিয়ন্ত্রণ সরাসরি জনগণের চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধপ্রাপ্যতার ওপর প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশে ওষুধের দাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে। একই ওষুধের ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডে দামের বড় পার্থক্য, প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এবং কার্যকর নজরদারির অভাব সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জন্য সরকার নির্ধারিত মূল্য চালু করা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পদ্ধতিই নির্ধারণ করবে এর সাফল্য বা ব্যর্থতা। সরকার চার বছরের সময় দিয়ে ধাপে ধাপে নির্ধারিত মূল্যে আসার সুযোগ রেখেছে, যা শিল্পখাতের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক। হঠাৎ কঠোর মূল্যনিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে-সেই বিবেচনায় ধাপে ধাপে সমন্বয়ের সুযোগ যুক্তিসংগত। একই সঙ্গে সরকার যে অন্যান্য প্রায় ১১০০ ওষুধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দাম না বেঁধে দামের একটি পরিসীমা নির্ধারণের কথা বলেছে, সেটিও বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের ভিন্ন নীতি প্রতিযোগিতা ও সরবরাহ বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে এখানে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকার নির্ধারিত মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে-সেটির স্বচ্ছতা ও তথ্যভিত্তিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের মূল্য, আমদানি নির্ভরতা ও বৈশি^ক বাজার পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিলে ওষুধ উৎপাদনে অনীহা তৈরি হতে পারে। এছাড়াও মূল্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মান ও সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তদারকি। অতীতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত দামের বাইরে ওষুধ বিক্রি হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই নীতিমালা কার্যকর করতে হলে ওষুধ প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং কঠোর কিন্তু ন্যায্য শাস্তির ব্যবস্থা অপরিহার্য। সব মিলিয়ে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দামে নিয়ন্ত্রণ একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এটি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিল্পের টেকসই বিকাশ ও বাজার স্থিতিশীলতা-এই তিনটির ভারসাম্য রক্ষা করেই এই নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। সঠিক প্রয়োগ হলে এই সিদ্ধান্ত সত্যিই যুগান্তকারী হয়ে উঠতে পারে; ভুল বাস্তবায়নে উল্টো সংকটও তৈরি হতে পারে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button