সম্পাদকীয়

রিকশার পরিত্যক্ত ব্যাটারির তেজস্ক্রিয়তার দূষণ কমাতে হবে

দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে-এটি অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু এ খাতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেভাবে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চলছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রকাশ্যে লোকালয়ের ভেতরে-বাইরে যত্রতত্র ব্যাটারি ভাঙা এবং সিসা গলানোর প্রক্রিয়া পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। মাটি, পানি ও বাতাসে এই বিষাক্ত ধাতু মিশে গিয়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকে দূষিত করে তুলছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশার কারণে প্রতিবছর দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সিসা, অ্যাসিড ও ব্যাটারি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। ৭০ শতাংশ ব্যাটারি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভাঙা হয়। ফলে শুধু ঢাকায় বসবাসরত ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে উদ্বেগজনক মাত্রার বেশি সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে আনুমানিক ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায়ই রয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ। এই রিকশাগুলো চলে ‘সিসা, অ্যাসিড ও ব্যাটারি’র শক্তি ব্যবহার করে। এ সিসার কারণেই মানুষের উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়, অকাল গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশের মাটি, পানি, বাতাসের মাধ্যমে সিসা খাদ্যে প্রবেশ করছে। আর খাবারের মাধ্যমে সিসা ঢুকে যাচ্ছে শরীরে। তাই মানুষের দেহেও মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি। সিসা মাটিতে ৭০০ বছর পর্যন্ত টিকে থেকে মানবদেহের ক্ষতি করে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। মানভেদে রিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারির আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ এক বছর। ফলে এসব ব্যাটারি ঘন ঘন পালটাতে হয়। এতে সিসার উপস্থিতি আরও বাড়ে। ঢাকা ও আশপাশের শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়ানো-ছিটানো কারখানার কর্মীরা কোনোরকম ব্যবস্থাপনা বা সুরক্ষা ছাড়াই খালি হাতে ব্যাটারি খুলছে। সেখান থেকে সিসা বের করছে, আবার ব্যবহার করছে বা গলাচ্ছে। নতুনভাবে ব্যাটারি তৈরি করছে। এ সময় সিসাসহ অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিপজ্জনক বর্জ্যও বেড়ে যায়। এই বর্জ্যগুলো মাটি, পানি, বাতাস ও খাদ্যে মিশে মানবদেহে বিষাক্ত সিসার পরিমাণ বাড়ায় এবং মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে। এ সমস্যার সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুচিন্তিত পরিকল্পনা। প্রথমত, ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা এবং অনুমোদনহীন কারখানাগুলোর পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যান্ট স্থাপন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে, যা পরিবেশের ওপর কম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সিসাদূষণ প্রতিরোধে সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button