আইএমএফের সতর্কতা ও বাংলাদেশের সামনে সংস্কারের কঠিন পরীক্ষা

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়; এটি দীর্ঘদিনের বৈষম্য, বঞ্চনা ও শাসনগত ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের বিস্ফোরণ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়া এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক আর্টিকেল-ফোর কান্ট্রি স্টাফ রিপোর্ট বলছে, এই রূপান্তরপর্বে কিছু অগ্রগতি হলেও কাঠামোগত সংস্কারে গতি না এলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের প্রথম ১২ থেকে ১৮ মাস হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা এখনও অটুট। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নামলেও সংস্কার বাস্তবায়ন হলে তা আবার ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে এই সম্ভাবনার বিপরীতে ঝুঁকিও বড়। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে নি¤œ আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে চাপে রেখেছে। বৈদেশিক খাতের চাপ, রিজার্ভ সংকট ও বিনিময় হারের অস্থিরতা অর্থনীতির দুর্বলতা প্রকাশ করছে। আইএমএফের মতে, বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তির সংকটই ২০২৪ সালের অস্থিরতার অন্যতম মূল কারণ ছিল, যা সমাধান না হলে স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতাকে আইএমএফ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনি¤œ হওয়ায় সরকারের ব্যয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ঝুঁকিতে পড়ছে। ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর কাঠামো সরলীকরণ এবং ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের মতো রাজনৈতিকভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে নতুন সরকারকে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লোকসান কমাতে শুল্ক ও ভর্তুকি সংস্কারের রোডম্যাপ জরুরি। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা আরেকটি বড় সতর্কসংকেত। অনাদায়ী ঋণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এবং সম্পদের গুণগত মান নিয়ে অনিশ্চয়তা আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করছে। আইএমএফ এখানে বিশ^াসযোগ্য সংস্কার কৌশল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শও এসেছে। সব মিলিয়ে আইএমএফের বার্তা স্পষ্ট: বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে, কিন্তু সময় সীমিত। গণঅভ্যুত্থান যে বৈষম্য ও শাসন সংকটের বিরুদ্ধে জনরায় দিয়েছে, তা উপেক্ষা করলে অর্থনৈতিক সংস্কারও বিশ^াসযোগ্য হবে না। নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর।
