জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল: অব্যবস্থাপনার ভারে রোগীর অসহায়তা

বিশ^ ক্যান্সার দিবসের প্রাক্কালে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ) নিয়ে প্রকাশিত সরকারি মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক নির্মম বাস্তবতা সামনে এনেছে। ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান রাষ্ট্রীয় কেন্দ্র হয়েও এই প্রতিষ্ঠানটি আজ বহু রোগীর কাছে ভোগান্তি, হয়রানি ও বঞ্চনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি পরিচালিত প্রভাব মূল্যায়নে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে এসে ৪১ শতাংশের বেশি রোগী হয়রানির শিকার এবং অর্ধেকের বেশি রোগী অ্যাম্বুলেন্স সেবায় দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। এমন চিত্র শুধু উদ্বেগজনক নয়, জাতীয় লজ্জারও। সমস্যার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শী পরিকল্পনা। হাসপাতালটিতে থাকা ১২১ ধরনের যন্ত্রপাতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি ব্যয়বহুল যন্ত্র দীর্ঘদিন অচল। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় এমআরআই, সিটি স্ক্যান ও লিনিয়ার এক্সিলারেটরের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্র কার্যত অচল পড়ে আছে। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরে ব্যয়বহুল পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত আট বছরে বহির্বিভাগ, ভর্তি ও জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ জনবল ও শয্যা সক্ষমতা সে অনুযায়ী বাড়েনি। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি কার্যত চলছে ৩০০ শয্যার জনবল দিয়ে। এই বৈষম্যের ফল হিসেবে দীর্ঘ অপেক্ষা, ধীরগতির সেবা ও প্রশাসনিক অসহযোগিতা এখন নিয়মিত অভিজ্ঞতা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ। ২০০৩ সালে শুরু হয়ে ২০০৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকা উন্নয়ন প্রকল্পটি শেষ করতে লেগেছে ১৭ বছর। ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই ছাড়াই অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের তথ্য এই খাতে জবাবদিহির ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে। ক্যান্সার চিকিৎসা কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা নয়; এটি সময়নির্ভর, ব্যয়বহুল ও মাননির্ভর। দেশে যেখানে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেখানে জাতীয় পর্যায়ের প্রধান হাসপাতালের এই অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিদেশমুখিতা বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রা ক্ষয় হবে, আর দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসাবঞ্চিতই থেকে যাবেন। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত সংস্কার। অচল যন্ত্রপাতি দ্রুত সচল করা, পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট নিশ্চিত করা, জনবল বাড়ানো এবং রোগীবান্ধব ব্যবস্থাপনা চালু করা এখন আর বিলাসিতা নয়-এটি জরুরি দায়িত্ব। পাশাপাশি ক্যান্সার রোগী নিবন্ধন, গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশ^ ক্যান্সার দিবসের প্রতিপাদ্যের আলোকে, ক্যান্সার চিকিৎসায় ‘একতা’ তখনই অর্থবহ হবে, যখন রোগীর কষ্ট লাঘবই হবে নীতির কেন্দ্রবিন্দু।
