প্রার্থীদের সম্পদ ও কর তথ্য: স্বচ্ছতার অগ্রগতি, জবাবদিহির চ্যালেঞ্জ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের আর্থিক তথ্য প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অনুশীলন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) প্রার্থীদের আয়, কর প্রদান ও ঋণসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। সুজনের তথ্যানুসারে, এবারের নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ১ হাজার ৩১৯ জন আয়কর প্রদানের তথ্য দিয়েছেন। যদিও এটি আগের নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, তবুও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী আয়কর বিবরণী দাখিল না করায় মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রার্থীদের আর্থিক তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক ও যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। ঋণগ্রহীতা প্রার্থীর সংখ্যা ৫১৯ জন, যা মোট প্রার্থীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ঋণ গ্রহণ স্বাভাবিক আর্থিক কর্মকা-ের অংশ হলেও বড় অঙ্কের ঋণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্ভাব্য সম্পর্ক নীতিনির্ধারণে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে। বিশেষত, পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া ৭৫ জন প্রার্থীর তথ্য জনস্বার্থে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রার্থীদের আয়ের তথ্য সমাজে বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরে। প্রায় ৪১ শতাংশ প্রার্থীর বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকার নিচে, আবার ৯৫ জন প্রার্থীর আয় এক কোটি টাকার বেশি। এই বৈষম্য রাজনীতিতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন উত্থাপন করে। সংসদে নীতিনির্ধারণে যেন ধনী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য না ঘটে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের সতর্ক থাকা জরুরি। ইতিবাচক দিক হলো, আয়কর প্রদানকারী প্রার্থীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা কর সংস্কৃতির উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার ইঙ্গিত দেয়। তবে অনেক প্রার্থী খুব কম কর প্রদান করেছেন বা আয়ের তথ্য অসম্পূর্ণ রেখেছেন, যা তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। প্রার্থীদের আর্থিক তথ্য প্রকাশ কেবল একটি প্রশাসনিক শর্ত নয়; এটি ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বশর্ত। নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগে হলফনামা যাচাই, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ^াসযোগ্যতা বাড়বে। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোটের সংখ্যায় নয়, বরং স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভরশীল-এই বাস্তবতা স্মরণ রেখে সংস্কার ও তদারকির উদ্যোগ জোরদার করাই সময়ের দাবি।
