নির্বাচনে এআই-অপতথ্য ঠেকাতে পদক্ষেপ নিন

এআই প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর অস্ত্রেও পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ভুল তথ্য, ভুয়া ভিডিও, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর ও সাজানো বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটারকে বিভ্রান্ত করার সক্ষমতা এআইকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। আগে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে প্রয়োজন হতো বড় সংগঠন, বিপুল অর্থ ও দীর্ঘ পরিকল্পনা। এখন একটি ল্যাপটপ আর কিছু সফটওয়্যারই যথেষ্ট। এআই দিয়ে তৈরি করা যায় এমন ভিডিও, যেখানে কোনো প্রার্থী এমন কথা বলছেন—যা তিনি আদৌ বলেননি। তৈরি করা যায় এমন অডিও, যা হুবহু মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো। সাধারণ ভোটারের পক্ষে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা এই ঝুঁকিকে মহামারির সঙ্গে তুলনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকার সবখানেই নির্বাচনের সময় এআইনির্ভর বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদাহরণ মিলছে। বিশ্বখ্যাত গবেষক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বারবার সতর্ক করছেন। তাদের ভাষায়, সমন্বিত এআই বট ও কনটেন্ট ফ্যাক্টরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ভরে ফেলছে। এসব বট মানুষের মতো আচরণ করে, মতামত দেয়, বিতর্ক তৈরি করে। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তাকে জনপ্রিয় বলে প্রতিষ্ঠা করে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভার্চুয়াল জগতে যে ‘এআই-অপতথ্যের মহামারি’ শুরু হয়েছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং সুস্থ গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এক অশনিসংকেত। ইউএনডিপির ই-মনিটর প্লাস প্ল্যাটফর্মের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৮৬ হাজারের বেশি এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্ত হওয়া প্রমাণ করে অপপ্রচারের মাত্রা কতটা ভয়াবহ। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার এখন আর শুধু কারিগরি উৎকর্ষের বিষয় নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘ডিজিটাল সন্ত্রাস’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এসব কনটেন্টের একটি বড় অংশই হিংসাত্মক ও রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক। পরিতাপের বিষয় হলো, এসব বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের সিংহভাগই ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সরাসরি প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে। এআই সমস্যাকে আরো জটিল করেছে একটি কারণে। সেটি হলো গতি। ভুল তথ্য এখন আর দিনে দিনে ছড়ায় না। ছড়ায় মিনিটে মিনিটে। একটি ভুয়া ভিডিও কয়েক ঘণ্টায় লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ততক্ষণে সত্য যাচাই করার সুযোগ শেষ। এআই নিজে কোনো শত্রু নয়। শত্রু হলো এর দায়িত্বহীন ব্যবহার। নির্বাচন একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এআই যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে গণতন্ত্র থাকবে কাগজে, বাস্তবে নয়। এ কারণেই এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি। এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
