োসহিংসতার ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের দায়

মাজার হামলা ও সম্প্রীতির সংকট
বাংলাদেশে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ঐতিহাসিকভাবে সমাজের এক শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাজারকেন্দ্রিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা এই সহাবস্থানের ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘সম্প্রীতি যাত্রা’র গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৩৪টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৯৭টি প্রমাণিত। এসব হামলার অধিকাংশই ধর্মীয় মতবিরোধ থেকে উদ্ভূত হলেও স্থানীয় ও রাজনৈতিক বিরোধও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এই পরিসংখ্যান শুধু সহিংসতার মাত্রা নয়, বরং সামাজিক বিভাজনের গভীরতাও নির্দেশ করে। ধর্মীয় মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে সহিংসতা একটি বহুত্ববাদী সমাজের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণে ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা ধর্মকে রাজনৈতিক বা সামাজিক সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি প্রকাশ করে। আরও উদ্বেগজনক হলো হামলার ঘটনায় প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার তথ্য। মাত্র ১১টি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং প্রশাসনিক সক্রিয়তা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা সহিংসতার সংস্কৃতি উসকে দেয় এবং অপরাধীদের জন্য দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি করে। রাষ্ট্রের এই দুর্বলতা শুধু নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। গোলটেবিল আলোচনায় রাজনৈতিক ও নাগরিক প্রতিনিধিরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলেও একটি সাধারণ উদ্বেগ স্পষ্ট-নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কেউ কেউ সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, কেউ বিভেদমূলক রাজনীতির কথা বলেছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করেছেন। এই বহুমাত্রিক বক্তব্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যাটি কেবল ধর্মীয় নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। মাজার হামলার ঘটনাগুলো বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর আঘাত। সুফি ঐতিহ্য ও লোকজ ধর্মীয় চর্চা এ দেশের সামাজিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সহিংসতা কেবল একটি সম্প্রদায়ের নয়, জাতীয় পরিচয়েরও ক্ষতি করে। এই পরিস্থিতিতে সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ ও বিচার নিশ্চিত করা। এবং সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদী মূল্যবোধ জোরদারে রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সহনশীলতার চর্চা বাড়ানো জরুরি। সহিংসতার ধারাবাহিকতা ভাঙতে হলে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সম্প্রীতি কেবল নৈতিক প্রত্যাশা নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ভিত্তি। এই দায়বোধকে কার্যকর নীতিতে রূপ দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
