মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি-অর্থনীতির নীরব সংকেত

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা গত আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য নতুন করে উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে। বিশেষত খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছানো নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনে সরাসরি চাপ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ধীরে কমার প্রবণতা থাকলেও নভেম্বর থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়। জানুয়ারিতে সেই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক নগদ প্রবাহ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে টাকা আছে, কিন্তু পণ্য ও উৎপাদন পর্যাপ্ত নয়-এই চিরাচরিত বৈপরীত্যই মূল্যস্ফীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির মধ্যে বৈপরীত্যপূর্ণ প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্যপণ্যে পুনরায় ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি শহরের তুলনায় সামান্য বেশি হওয়া দারিদ্র্য ও আয়ের বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়া গ্রামীণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির নতুন মাত্রা নির্দেশ করে। মূল্যস্ফীতি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক আস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায়, সঞ্চয়কে নিরুৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। সামনে রমজান মাস ও নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা মূল্যস্ফীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে-এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নীতিনির্ধারকদের জন্য বার্তা স্পষ্ট। স্বল্পমেয়াদি বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে প্রণোদনা, সরবরাহ চেইনে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকিতে স্বচ্ছতা ছাড়া মূল্যস্ফীতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আর্থিক নীতিতে শৃঙ্খলা এবং রাজস্ব নীতিতে সমন্বয় জরুরি। মূল্যস্ফীতি একটি অর্থনীতির তাপমাত্রা। জানুয়ারির এই ঊর্ধ্বগতি সতর্ক সংকেত-যা অবহেলা করলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
