সম্পাদকীয়

সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুত হোন

# মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার শঙ্কা #

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে ইরান ও তার মিত্রদের পাল্টা হামলা ক্রমশ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে বাহরাইন, আমিরাত ও কাতার খুব দ্রুত এই যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে অন্তত তিনটি ইউরোপীয় শক্তি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ফলে সহসা এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার মতো কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তার ঢেউ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও লাগবে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলারের মতো বেড়ে গেছে। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ ডলার করে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে চলে যাবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের তেল পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দিকে আসা অনেক কমে যেতে পারে। ঘুরপথে আনা হলেও আমদানি খরচ অনেক বেড়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। আবার আমাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিও প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। এলএনজি আসা ব্যাহত হলে দেশে গ্যাসসংকট তীব্র হতে পারে। বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। আমাদের মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশই যায় সৌদি আরবে। দ্বিতীয় স্থানে আছে কাতার, চতুর্থ কুয়েত এবং ষষ্ঠ আরব আমিরাত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি দেশেই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে আমাদের শ্রমবাজার। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে আরব আমিরাতে একজন ও বাহরাইনে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। কুয়েতে চারজন ও বাহরাইনে তিনজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ বা সীমিত থাকায় অনেকে জরুরি প্রয়োজনে বা ছুটি শেষে যথাসময়ে ফিরতে পারছেন না। কারো কারো ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যুদ্ধ স্থায়ী হলে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে আমাদের রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের ওপরও। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে উভয় পক্ষ ক্রমেই তাদের আক্রমণ শাণিত করছে। যুদ্ধ বন্ধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। ‘ডিবেটিং ক্লাব’ হিসেবে পরিচিত জাতিসংঘ কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে বলেও মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করতে সেখানকার পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালায় এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে, তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে তা কল্পনা করাও কঠিন হবে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দফায় দফায় আলোচনা হচ্ছিল। পৃথিবী আশাবাদী হচ্ছিল, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু হঠাৎ ইরানে আক্রমণ করে বসা এবং শীর্ষনেতা খামেনিসহ বহু শীর্ষস্থানীয় নেতাকে হত্যা করা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এই অবস্থায় আমরা মনে করি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো দেশগুলোর যুদ্ধে জড়িত হওয়ার হুমকি প্রকৃত অর্থেই বিশ্বসভ্যতাকে হুমকির মুখোমুখি করবে। আমরা চাই, যুদ্ধ নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হোক।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button