গুম নামক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অবসান হোক

# গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল কেন? #
একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত হলো নাগরিকের জীবনের সুরক্ষা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যে নতুন আকাক্সক্ষার জন্ম দিয়েছে, তার মূলে ছিল বিগত স্বৈরশাসনের নিপীড়ন ও গুম নামক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের স্থায়ী অবসান। কিন্তু অতি সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’টি সংসদে আইনে পরিণত না করে বাতিল হয়ে যাওয়ায় জনমনে বিষয়টি গভীর উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। কারও কারও কাছে এটি মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এক বড় ধরনের ধাক্কা হিসাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। বলা বাহুল্য, বিগত দেড় দশকে আয়নাঘর কিংবা গুমের যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল, তা ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর এবং একটি শক্তিশালী অধ্যাদেশ জারি করার মাধ্যমে যে আশার আলো দেখিয়েছিল, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলে তা থমকে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হচ্ছে, গুমের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) মাধ্যমে করা হবে এবং আইনটিকে আরও শক্তিশালী করা হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি আইনি জটিলতা ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের বিশেষজ্ঞদের অভিমত অত্যন্ত স্পষ্ট-আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রধানত মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহারে গুম নিয়ে কাজ করে। কিন্তু ফৌজদারি দ-বিধিতে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ও চলমান অপরাধ হিসাবে সংজ্ঞায়িত না করলে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটা প্রতিটি গুমের বিচার নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। হত্যা এবং গণহত্যার মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনই বিচ্ছিন্ন গুম এবং পরিকল্পিত গণগুমের বিচারিক প্রক্রিয়াও ভিন্ন হওয়া আবশ্যক। বাতিল হওয়া অধ্যাদেশটিতে গুমকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষকে আইনি সুরক্ষা দিত। এখন সেই অধ্যাদেশটি না থাকায় দেশে গুমের কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা অবশিষ্ট রইল না, যা এক ভয়াবহ আইনি শূন্যতা তৈরি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগতভাবে গুমের শিকার এবং আইনটি আরও শক্তিশালী করতে চান-এই সদিচ্ছাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অধ্যাদেশটি বহাল রেখে কেন পরে সংশোধনী আনা হলো না? বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কারের নামে এই বিলম্ব বা অনীহা রাজনৈতিক মহলে স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন বা পুরোনো পথেই হাঁটার শঙ্কা তৈরি করছে। সুশীল সমাজ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি উপেক্ষা করে জনগুরুত্বপূর্ণ এই আইনটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের মনে রাখা উচিত, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙার জন্য। গুমের ভয় দেখিয়ে ভিন্নমত দমন করার যে নজির বিগত সরকার স্থাপন করেছিল, সেই একই ছায়া যদি বর্তমান প্রশাসনের ওপর পড়ে, তবে তা হবে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। জনগণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো করুণা নয়, বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, কালক্ষেপণ না করে সরকার গুম প্রতিরোধে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ আইন অবিলম্বে সংসদে পাশ করবে।
