সম্পাদকীয়

কঠোর জবাবদিহি প্রয়োজন

# অনুমোদন পায়নি সমাজসেবার প্রকল্প #

জনস্বার্থে সরকার নানামুখী প্রকল্প গ্রহণ করে। সেসব প্রকল্পে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচও হয়। কিন্তু সেই প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, উপকারভোগী, বাস্তবায়ন কাজের মান, সময় ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকে। দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের জীবনমান উন্নয়নের নামে ৬১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল সমাজসেবা অধিদপ্তর। কিন্তু প্রকল্পের উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয় ধরা হয় মাত্র ১৩ শতাংশের মতো। বাকি প্রায় ৮৭ শতাংশই রয়েছে পরামর্শক নিয়োগ, প্রশাসনিক ব্যয়, দেশে-বিদেশে ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য খাতে। ব্যয় পরিকল্পনায় অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রকল্পটি ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ক্রমেই বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। নিম্নাঞ্চলের বহু বাড়িঘর, আবাদি জমি, মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। নোনা পানির আগ্রাসনে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এমন প্রতিকূলতার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ উপকূল ছেড়ে বিভিন্ন শহরাঞ্চলে এসে উঠছে। আরো অনেক কারণেই উদ্বাস্তু বা ভাসমান মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হওয়া এসব মানুষের পাশে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতেই হবে। সেদিক থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তর যে প্রকল্প নিয়েছে তা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু ব্যয় পরিকল্পনায় এমন অসামঞ্জস্য কেন? যাদের জন্য প্রকল্প তারা পাবে প্রকল্পের মাত্র ১৩ শতাংশ বরাদ্দ? এমনটা চিন্তা করাটাও স্বাভাবিক নয়। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের শতভাগ অনুদানে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছর ৯ মাস মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব ছিল। খুলনা সিটি করপোরেশন, সাতক্ষীরা পৌরসভা, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও সিরাজগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় এটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। প্রকল্পের নথির তথ্য অনুযায়ী, মোট বাজেটের মধ্যে মাত্র আট কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা মোট ব্যয়ের মাত্র ১৩.২৩ শতাংশ। এই অর্থ দিয়ে ২৭০ জন নারী, ৩০ জন প্রতিবন্ধীসহ মোট ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আয়বর্ধক কর্মকা-ে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি শিশুযতœ, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং নারীবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সামাজিক সেবার মাধ্যমে আরো দেড় হাজার মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে প্রকল্পের বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করার প্রস্তাব ছিল বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা খাতে। শুধু দেশি-বিদেশি ৪৭৩ জন পরামর্শক নিয়োগেই ব্যয় ধরা হয় ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৮.৩৩ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয় ১০ কোটি সাত লাখ ৬৫ হাজার টাকা, অফিস ভাড়ার জন্য তিন কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং দেশি-বিদেশি ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় চার কোটি ৭৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের নামে কী হয়, কারা কতটা উপকারভোগী হয়, অপচয় হয় কি নাÑসেসব বিষয় প্রকল্প অনুমোদনের আগেই বিস্তারিত পর্যালোচনা করতে হবে, যেমনটা এ ক্ষেত্রে করেছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি। প্রকল্পের অনুমোদন থেকে বাস্তবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button