রমজানের আগেই অসহনীয় নিত্যপণ্যের বাজার!

লাগিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মাছ ও মাংস, কাঁচা সবজি, মসলা, ফলসহ ইফতার সামগ্রীর দাম, বাজারে গিয়ে রোজার পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারন ক্রেতারা
মোঃ আশিকুর রহমান ঃ মুসলিম উম্মার শ্রেষ্ঠ মাস, রহমত বরকতের মাস, আল্লাহর নৈকট্য ও গুনাহ্ হতে মুক্তি প্রাপ্তির পবিত্র মাস মাহে রমজান যেন মুমিনের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। গ্রীষ্মের তাপদাহ্রে দীর্ঘ সময় পার করে সকল প্রকার পানাহার হতে বিরত থেকে স্রষ্টার মহান হুকুম পালন করতে টানা একটি মাস সিয়াম সাধনা করবে মুসলিম উম্মাহ। তবে দুঃখজনক বিষয় মাহে রমজান আসলেই যেন হালচাল পাল্টাতে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের। মাহে রমজানের দু’ একদিন আগে থেকেই অসহনীয় হতে শুরু করে খুলনার নিত্যপন্যের বাজারগুলো। ইতোমধ্যেই নগরীর বাজারগুলোত দাম বাড়তে শুরু করেছে মাছ, মাংস, সবজি, মসলা, ফলসহ ইফতার সামগ্রীর। দু’দিনের ব্যবধানে মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ২০/৩০ টাকা, কয়েকদিন আগেও ৬৫০টাকার গরু’র মাংস এখন ৭০০ টাকা, খাসির মাংস কেজিতে বেড়েছে ১০০ টাকা, দু’দিন আগের ৬৫ টাকার পেঁয়াজ এখন ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন সবজি বাজারে আসতে না আসতেই লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে, স্বস্তি নেই ফলের বাজারেও। বাজারে আসা একাধিক ক্রেতা জানিয়েছেন, এটা কোনো নতুন রূপ নয়, প্রতি বছরই রোজার আগে দ্রব্য মূল্যের দাম চোখের পলকে বেড়ে যায়। এটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, রমজান আসলেই ডাকাতি করা শুরু হয়ে যাবে ব্যবসায়ীদের। রোজার আগেই নিত্যপণ্যের দাম অসহনীয় হওয়ার দরুন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাধারন আয়ের মানুষসহ সর্ব পেশাজীবি মানুষ। শনিবার (৯ মার্চ ) সকালে নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এমনই সব কথা।
চালের বাজারে, নাজিরশাল ৬২ হতে ৭০ টাকা, বাসমতি ৬৪ হতে ৬৯ টাকা, মিনিকেট মানভেদে ৫৬ হতে ৬২টাকা, বালাম-২৮ মানভেদে ৫০ থেকে ৫৩ টাকা, স্বর্ণা মানভেদে ৪৪ হতে ৪৬ টাকা এবং মোটা ৪৩ হতে সাড়ে ৪৩ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাল বিক্রেতারা জানিয়েছে, চালের দাম স্থিতিশীল আছে, দাম বাড়েনি। জাতীয় নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের পর দু’চার দিন পর পর্যন্ত চালের দাম বাড়তি ছিল। কিন্তু নতুন সরকার এসে চালের বাজার নিয়ন্ত্রন করে ফেলে।
মাছের বাজারে, ইলিশ ১ কেজির উপরে বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ হতে ১৯০০ টাকা দরে, ৭’শ গ্রামের ইলিশ প্রতি কেজি ১৪০০ টাকা, ৬’শ গ্রামের ইলিশ প্রতি কেজি ১২০০ টাকা, ঝাটকা ইলিশ প্রতিকেজি ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। দু’দিনের ব্যবধানে ইলিশের দাম প্রতি কেজিতে ১০০ হতে ১৫০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া কাতলা (বড়) প্রতি কেজি ৫০০ টাকা, রুই (বড়) ৫০০ টাকা, গলদা চিংড়ি ১২০০ টাকা, বাগদা চিংড়ি ১২০০ টাকা, পারসে ৬০০ টাকা, বোয়াল ৮০০ টাকা, ভেটকি ৮০০ টাকা, টেংরা ৮০০ টাকা, পাবদা ৫০০ টাকা। এই সকল মাছগুলোতে দু’দিনের ব্যবধানে কেজি প্রতি প্রায় ১০০ টাকার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে । খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে পাইকারী বাজারে মাছের দাম বেশি, তারা বর্তমান সময়টিতে বাড়তি দামেই পাইকারী বাজার হতে মাছ কিনছেন।
মাংস ও মুরগীর বাজারে, কয়েক দিন আগে বিক্রি হওয়া ৬৫০ টাকার গরুর মাংস এখন ৭০০ টাকা, ১০০০ টাকার কেজিতে বিক্রি হওয়া খাশির মাংস এখন ১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে দু’দিনে ব্যবধানে মুরগীর দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে, প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২০/৩০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে ব্রয়লার (ছোট) ২১০ টাকা, ব্্রয়লার (বড়) ২২০ টাকা, কক ৩০০ টাকা, লেয়ার সাদা ৩০০ টাকা, লেয়ার লাল ৩২০ টাকা, সোনালী ৩০০ টাকা, কয়লার ৩০০ টাকা, প্যারিস ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। খুচরা মুরগি ব্যবসায়ীরা বলছেন, খামারীরা রাতারাতি মুরগীর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা খামারীদের কাছ থেকে যে দামে কিনি, তার বাইরে ১০ টাকা বেশি দরে বিক্রি করি। কাঁচা সবজি বাজারে, প্রতি কেজি ঝিঙে ১০০ টাকা, বেগুন ৫০ টাকা, ফুলকপি ৬০ টাকা, পাতা কপি ২০ টাকা, ওল কপি ৩০ টাকা, উচ্ছে ১০০ টাকা, গাজর ৪০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৫০ টাকা, ঢেঁড়শ ৮০ টাকা, কুশি ৬০ টাকা, সজিনা ৩০০ টাকা, পটল ১০০ টাকা, সীম ৪০ টাকা, চাল কুমড়া ৫০ টাকা, কুমড়া ৪০ টাকা, কচুরলতি ৬০ টাকা, খিরাই ৬০ টাকা, জিয়া ঝাল ১২০ টাকা, বিন্দু ঝাল ১০০ টাকা ও বগুড়ার ঝাল ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতিটি সবজির দামে কেজি ১০/১৫ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তারা বলছেন, বর্তমানে মুকামে সবজির দাম বেশি। যে কারণে পাইকারী বাজারে সবজির দাম বেশি। যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। মসলা বাজারে, সয়াবিন প্রতি কেজি ১৬২ টাকা, সুপার ১৪০ টাকা, পাম্প ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। দু’দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজ কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। দু’দিনের আগের ৭০ টাকার পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়, রসুন ১৫০ টাকা, রসুন (চায়না) ২২০ টাকা, আলু ৩০ টাকা, ছোলা মানভেদে ৯৫ হতে ১০০ টাকা, ছোলার বেসন ১১০ টাকা, বুটের বেসন ৯০ টাকা, চিনি ১৪০ টাকা, আটা খোলা ৪০ টাকা, ময়দা ৫৫ টাকা, আটা প্যাকেট ৫০ টাকা, ময়দা প্যাকেট ৭০টাকা, লাল ও সাদা চিড়া ৫৫ টাকা, বালাম মুড়ি ৮০ টাকা, বরিশাল মুড়ি ১২০ টাকা, হাতে ভাজা ৯০ টাকা ও মোটা মুড়ি ৮০ টাকা, মুগডাল ১৫০ টাকা, রুহ্ আফজা (৭৫০ মিঃলি) ৪৯০ টাকা, রুহ্ আফজা (৩০০ মিঃলি) ২৮০ টাকা, ট্যাং (৭৫০ মিঃলি) ৭৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোলা কেজি প্রতি ৫টাকা, ট্যাং ও রুহ্ আফজা প্রতি জারে ১০০টার উর্ধ্বে দাম বেড়েছে।
ফলের বাজারে, আপেল ফুজি ২৭০ টাকা, আপেল হানি ২৩০ টাকা, মালটা ৩৫০ টাকা, কমলা হেকড়া ২৫০টাকা, কমলা (চায়না) ২৮০ টাকা, আঙ্গুর সাদা ২৮০ টাকা, আঙ্গুর কালো ৩৫০ টাকা, বেদানা (বড়) ৩৫০ টাকা, বেদানা (ছোট) ৩০০ টাকা, তরমুজ প্রতি কেজি ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ফলে ১০/১৫ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া খেজুর প্রতি কেজি আজোয়া ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১২০০ টাকা, দাবাস ৫০০ টাকা, নাগান ৬০০ টাকা, বস্তা খেজুর ২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। খেজুরের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে। নগরীর মের্সাস শাহিন ট্রের্ডাসের সত্ত্বাধীকারি চাল ব্যবসায়ী শাহিন হোসেন জানান, বর্তমানে চালের বাজার স্থিতিশীল আছে। কোনো চালের দামেই বাড়েনি। আগের দামই আছে। নির্বাচনের পূর্বে এবং নির্বাচনের পর দু’চার দিন চালের দাম বাড়তি ছিল। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে চালের বাজার নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে। তাছাড়া সামনে বাজারে নতুন চাল আসবে, তখন দাম আরো কমে আসবে বলে ধারণা করছি। নগরীর মেসার্স নয়ন পোল্ট্রি হাউজের মালিক মুরগী ব্যবসায়ী নয়ন জানান, আমি একজন খুচরা বিক্রেতা। খুলনার স্থানীয় এলাকার খামারীদের খামার হতে মুরগী পাইকারী কিনে এনে দোকানে বিক্রি করি। খামারীরা যখন যে দাম কাটে তা হতে খরচ খরচা বাদে প্রতি কেজি মুরগীতে ৮/১০ টাকা লাভ করে থাকি। বর্তমানে ব্রয়লারসহ প্রতিটি খাবারের মুরগীর দাম খামারীরা বেশি নিচ্ছে, যার দরুন দামের প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। নগরীর দৌলতপুর বাজারের সবজি বিক্রেতা কামাল জানান, প্রান্তিক চাষীরা তাদের ক্ষেতের উৎপাদিত গ্রীষ্মকালীন সবজি ঝিড়ে, পটল, বরবটি, ঢেড়শ, ওলসহ ইত্যাদি বাজারে তুলছেন। গ্রীষ্মকালীন এই সবজি বাজারে সরবাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেশি। বাজারে যত বেশি সবজির সরবরাহ বাড়বে, দাম ততই কমবে। তাছাড়া মুকামে বর্তমানে সবজির দাম বেশি। প্রথম মুকাম হতে ব্যপারীরা সবজি ক্রয় করে। পরে পাইকারি বাজারে তাদের মতো করে বিক্রি করে থাকে। আমরা খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারী বাজার হতে সবজি ক্রয় করে খুচরা বাজারে বিক্রি করি। মুকাবে সবজির দাম বেশি থাকায় খুচরা বাজারেও সবজির দাম বাড়তি। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে গ্রীষ্মকালীন সবজির দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে ক্রেতারা মনে করছেন রোজাকে সামনে রেখে বাজার সরগরম হয়ে উঠছে, এটা ভুল। গরুর মাংস বিক্রেতা মো. হোসেন জানান, বর্তমানে হাটে গরুর দাম অত্যন্ত বেশি। কয়েকদিন আগেও যে দামে গরু পাওয়া গেছে, বর্তমানে সেই তুলনায় গরুর দাম আকাশ ছোঁয়া। তাছাড়া গরু লালন-পালনে খাবারের দাম গৃস্থালীদের বেশি দরে কেনা লাগছে। যে কারণে তারা গরু বিক্রয়ের সময় আপনা আপনি দাম বেশি হাকাচ্ছেন। বর্তমানে ৭০০ টাকার নিচে গরুর মাংস বিক্রি কোনো উপায় নেই। ইলিশ মাছ বিক্রেতা বারেক হাওলাদার জানান, ইলিশের কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। আমরা রুপসা পাইকারি বাজার হতে যে দাম কিনি, খরচ খরচা বাদে কিছু লাভে বিক্রি করি। তবে বাজারে বর্তমানে বাজারে ইলিশসহ সব মাছের দামই একটু বাড়তি। চাকুরীজীবি ক্রেতা ফারুক হোসেন জানান, চলতি সম্ভব্য ১২ মার্চ হতে মাহে রোজা শুরু হবে। এই মাসের বেতন পেলাম ৯ ই মার্চ, শনিবার। আগে ভাগেই পিয়াজ, রসুন, তেল, ডাল, মুরগী- মাংসসহ মাছ কিনতে গিয়ে যেন মাথায় হাত। সব কিছুর দাম বাড়তি। মুরগীর দাম তো লাগামহীন। সবজির দাম আকাশ ছোয়া। রমজান মাসের আগেই এই অবস্থা, রমজান মাসে কি হবে। দু’দিন আগে যে ব্রয়লাম মুরগি ১৯০ টাকায় কিনেছি, গতকাল বাজারে তাই ২১০ টাকা। রাতারাতি ২০ টাকা বাড়তি। এটা কি ডাকাতি শুরু করেছে ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি দেখার কি কেউ নেই? ক্রেতা নাসরিন আক্তার জানান, গ্রীষ্মকালীন সবজি বাজারে আসতে না আসতেই দাম আকাশ ছোয়া। ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। এখনেই এই অবস্থা গোটা রমজান মাস তো পড়েই আছে। তাছাড়া মাছ, মাংস, ফল, মসলাসহ ইফতার সামগ্রীর দাম বাড়তি। গরুর মাংস একলাফে ৭০০টাকা, মুরগী ২২০, খাশি ১১০০ হাজার টাকা কেজি। সব কিছুর দামই বেশি। রমজান আসার আগেই বাড়তে শুরু করেছে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম। সাধারনত মানুষ তো গোটা রমজানে খেয়ে বেঁচে থাকতে হিমশিম খাবে। খুলনা বৃহত্তর সংগ্রাম সমান্বয় কমিটির মহা সচিব শেখ মোহাম্মাদ আলী জানান, আমাদের দেশের একটি ট্যাডিশন আছে রমজান আসলেই অসাধু ব্যবসায়ীর আধঘাট বেধে নেমে পড়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরী করতে। একই সাথে আমাদের দেশের মানুষের মধ্যেও একটি ট্যাডিশন আছে রমজান আসার আগেই বাজারে গিয়ে গোটা মাসের বাজার করতে হবে। আমাদের এই অভ্যাসটি পরিহার করতে হবে। কারণ আমাদের এই দূর্বলতা সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে আঙুল ফুলে কলা গাছ হতে শুরু করে। আমরা রমজানে গোটা মাসের বাজার এক সাথে না করে দু’তিন দিন পর পর আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গুলো কিনলে, তারা ওই সুযোগ আর পাবে না। আমি মনে করি সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা, বিশেষ করে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশনসহ ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষন নিয়মিত বাজার মনিটরিং করলে বাজার নিয়ন্ত্রনে থাকবে।



