গত বছরের চেয়ে ৭ লক্ষাধীক টাকা বেশী হাসিল আদায়

# কেসিসি ১৪ বছর ধরে পরিচালনা করছে জোড়াগেট পশুরহাট #
# সাড়ে ৭ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানীর বর্জ্য অপসারণ করলো কেসিসি #
খলিলুর রহমান সুমন ঃ গত ১৪ বছর ধরে একটানা কেসিসি নগরীর জোড়াগেট কোরবাণীর পশুরহাট পরিচালনা করে আসলেও এবার রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়েছে। খুলনা নগরীর জোড়াগেট কোরবানি পশুর হাটে এবার এক সপ্তাহে ৬ হাজার ২৬৮টি পশু বিক্রি হয়েছে। যা থেকে হাসিল হিসেবে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ২ কোটি ২৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫২৭ টাকা আয় হয়েছে। ২০২৩ সালে ৬ হাজার ২০টি পশু বিক্রি থেকে আয় হয়েছিল ২ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার ৬০২ টাকা। সে হিসেবে গতবারের চেয়ে এবার হাসিল বেশী আদায় হয়েছে ৭ লাখ ১৫ হাজার ৯১৫ টাকা। আর পশু বিক্রি বেশী হয় ২৪৮টি। এ বছর গরু বিক্রি হয় ৩৯৮২টি, যার থেকে হাসিল আদায় হয় ২ কোটি ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৫৮০ টাকা। ছাগল বিক্রি হয় ২১৬২টি, এ থেকে হাসিল আদায় হয় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ২শ’৭৭ টাকা। ভেড়া বিক্রি হয় ১২২টি, হাসিল আদায় হয় ৬৩ হাজার ৬শ’৭০ টাকা। দু’টি মহিষে হাসিল আদায় হয় ১৫ হাজার টাকা। এ হাটে মোট ৪৫ কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার টাকার পশু বিক্রি হয়। ২০২৩ সালে গরু বিক্রি হয় ৪০৮৯টি, যা থেকে হাসিল আদায় হয় ২ কোটি ৬ লাখ ১২ হাজার ৯৬০ টাকা। ছাগল বিক্রি হয় ১৯১১টি, যা থেকে হাসিল আদায় হয় ১২ লাখ ৪১ হাজার ২৪৭ টাকা। ভেড়া বিক্রি হয় ২০টি, যা থেকে হাসিল আদায় হয় ৮,৩৯৫ টাকা। ওই বছর ২ কোটি ২১ লাখ ৪ হাজার ৯৬২ টাকার পশু বিক্রি হয়। কেসিসির নথি সূত্রে এ তথ্য পাওয়া যায়। ওই নথি মতে, ২০২২ সালে এক সপ্তাহে ছয় হাজার ৭৬০টি পশু বিক্রি থেকে আয় ছিল ২ কোটি ২৫ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৫ টাকা। কেসিসি পরিচালিত এ হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের চেয়ে এ বছর ২০৭টি পশু বিক্রি বেশি হয়েছে। আর হাসিল আদায় ৪ লাখ টাকা বেড়েছে। এ হাটে ২০২০ সালে ৫ দিনে ছয় হাজার ১৬৯টি পশু বিক্রি থেকে হাসিল আদায় ছিল ১ কোটি ৬৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। করোনা মহামারির কারণে ২০১৯ সালের চেয়ে ২০২০ সালে এক হাজার ৬৩৬টি পশু বিক্রি কম হয়েছিল। আর হাসিল আদায় কমেছিল ৪৪ লাখ টাকা। আর ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে ৭৭৩টি পশু বিক্রি বেড়ে হাসিল আদায় বেড়েছিল ৪২ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। কেসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হাটে বেচাকেনা শেষ ২ দিনেই বাড়ে। কিন্তু এ বছর শেষ ২ দিনই আবহাওয়া ভালো ছিল। ফলে কোরবানির পশু বেচাকেনায় সমস্যা হয়নি। আর এ কারণে হাটে আসা লোকজন নির্বিঘেœ হাসিল দিয়েছেন। ফলে হাসিল আদায় বেড়েছে। তারা বলেন, গত ১০ জুন থেকে এ হাটে বেচা বিক্রি শুরু হয়। ১৭ জুন ভোর রাত ৪টায় এ হাটে বেচাকেনা শেষ করা হয়। এ সময়ের মধ্যে হাটে ছয় হাজার ২৬৮টি পশু বিক্রি হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ৯৮২টি গরু, ২ হাজার ১৬২টি ছাগল, ১২২টি ভেড়া ও ২টি মহিষ। এ থেকে কেসিসি হাসিল হিসেবে পেয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫শত ২৭ টাকা। ২০২৩ সালে ৬ হাজার ২০টি পশু বিক্রি থেকে আয় হয়েছিল ২ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার ৬০২ টাকা। ২০২২ সালে ৭ দিনে ছয় হাজার ৭৬০টি পশু বিক্রি থেকে হাসিল আদায় ছিল ২ কোটি ২৫ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৫ টাকা। ২০২১ সালে এ হাটে ছয় হাজার ৯৪০টি পশু বিক্রি হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ২৮০টি গরু, এক হাজার ৬৩০টি ছাগল ও ২১টি অন্যান্য। এ থেকে কেসিসি হাসিল হিসেবে পেয়েছে ২ কোটি ৪৩ হাজার ৪৫ টাকা। ২০২০ সালে ছয় হাজার ১৬৯টি পশু বিক্রি হয়। এর মধ্যে রয়েছে চার হাজার ৭৭২টি গরু, এক হাজার ৩৬০টি ছাগল ও ৩৬টি অন্যান্য। এ থেকে কেসিসি হাসিল হিসেবে পেয়েছে ১ কোটি ৬৪ লাখ ৭৭ হাজার ৭ টাকা। ২০১৯ সালে এ হাটে ৭৮০৫টি পশু বিক্রি হয়। এর মধ্যে ছিল ৬১৪৪টি গরু, ১৬৫৬টি ছাগল ও ৫টি ভেড়া। এ থেকে কেসিসি হাসিল হিসেবে পেয়েছিল ২ কোটি ৮ লাখ ৯ হাজার ৯৫৫ টাকা। ২০১৮ সালে হাসিল আদায় হয়েছিল ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮১ টাকা। পশু বিক্রি হয়েছিল ৭ হাজার ৩২টি। এর মধ্যে গরু ৫ হাজার ৩৮২টি ও ছাগল ১ হাজার ৬৪২টি বিক্রি হয়। ২০১৭ সালে হাসিল আদায় হয় ২ কোটি ১০ লাখ ৩০ হাজার ৩৪৩ টাকা। পশু বিক্রি হয় ৮ হাজার ৪০৩টি। এর মধ্যে গরু ছিল ৬ হাজার ৭৩৭টি, ছাগল ১ হাজার ৬৫৭টি আর ভেড়া ৫টি। উল্লেখ্য, কোরবানির পশুর কেনাবেচার জন্য প্রতি বছর খুলনা নগরীর জোড়াগেট পাইকারি কাঁচা বাজারে পশুর হাট বসায় কেসিসি। আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাট পরিচালনা করতো। ২০০৯ সালে এ হাট থেকে কেসিসির আয় ছিল ৪৭ লাখ টাকা। ২০১১ সাল থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হাট পরিচালনার উদ্যোগ নেয় কেসিসি। সেই থেকে এ হাটের মাধ্যমে কোটি টাকার রাজস্ব আয় করছে কেসিসি। ২০১১ সালে আয়ের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৭১ টাকা। বিক্রি হয়েছিল ৮ হাজার ৩৯৬টি পশু। ২০১২ সালে হাট থেকে ৭ হাজার ৬২৯টি পশু বিক্রি থেকে আয় হয় ১ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৯৮ টাকা। ২০১৩ সালে হাটে ৮ হাজার ৮৯১টি পশু বিক্রি থেকে রাজস্ব আয় হয় ১ কোটি ২৬ লাখ ৬ হাজার ৫১৮ টাকা। ২০১৪ সালে পশুর হাটে ১০ হাজার ১৫৫টি পশু বিক্রি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ৪২০ টাকা। ২০১৫ সালে হাসিল আদায় হয় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার ৪৩০ টাকা। ওই বছর পশু বিক্রি হয় ৯ হাজার ৩২৪টি, এর মধ্যে গরু ছিল ৭ হাজার ৯০৮টি, ছাগল ছিল ১ হাজার ৪১৬টি। ২০১৬ সালে হাসিল আদায় হয় ১ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৪৩ টাকা। ওই বছর পশু বিক্রি হয় ৯ হাজার ২৪৪টি, এর মধ্যে গরু ছিল ৭ হাজার ৬২৭টি, ছাগল ছিল ১ হাজার ৬১২টি ও ভেড়া ছিল ৫টি। এবার রাজস্ব বেশী আদায়ের কারণ গুলো হলো-আবহাওয়া অনুকূলে ছিল, পশুর আগমণ বেশী ছিল, কর্মকর্তা-কর্মচারিরা ছিল সোচ্ছার, ক্রেতা-বিক্রেতা যাতে হাসিলের টাকা কম না দেয় সে ব্যাপারে সবার তদারকি ছিল চোখে পড়ার মত। সর্বোপরি হাটে মেয়রের অবস্থান কর্মকর্তা-কর্মচারিদের উজ্জ্বিবিত করে তোলে। এসব কারণে এবার হাসিল আদায় বেশী হয়েছে বলে কেসিসির বাজার সুপার আঃ মাজেদ মোল্লা মনে করেন। তবে শেষ রাতে গরুর দাম পড়ে যাওয়ায় বড় বড় গরু হাট শেষে ফেরৎ চলে যায়। এসব গরু বিক্রি করতে পারলে হাসিল আরো বেশী হতো বলে এসব কর্মকর্তা মনে করেন। বাজার সুপার আঃ মাজেদ মোল্লা বলেন, এই পশুরহাট দক্ষিণাঞ্চলসহ খুলনা মহানগরীর মধ্যে একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। সড়কপথের পাশাপাশি নৌপথেও এখানে পশু আনার সুবিধা ছিল। তবে এবার নৌপথে বেশী পশু হাটে এসেছে। এবারের হাটে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা, জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন, কন্ট্রোল রুম, মেডিকেল টিমসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ছিল। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত এ হাটে পশু বেচাবিক্রি হয় বলে তিনি জানান। এদিকে ঈদের দিন রাত সাড়ে ৯টার মধ্যেই নগরীর সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো থেকে কোরবানীর পশুর বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনা অপসারণ করেছে কেসিসি। ঈদের দিন দুপুর দু’টা থেকে প্রায় ৮৫০ জন শ্রমিক-কর্মচারী একযোগে মাঠে নামে। সাড়ে ৭ ঘণ্টার মধ্যেই নগরীর সড়ক ও সেকেন্ডারি স্টেশনগুলো বর্জ্যমুক্ত হয়ে যায়। মঙ্গলবার ভোরে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বর্জ্যরে স্তুপ দেখা যায়নি। ঈদের দিন দুপুর দু’টা থেকেই নগরীতে কঞ্জারভেন্সি বিভাগের তৎপরতা শুরু হয়। প্রথম দিকে বর্জ্য অপসারণে ছিল ধীরগতি। বিকাল থেকে দ্রুত কাজ শুরু করেন শ্রমিকরা। রাত সাড়ে ৯ টা পর্যন্ত কেসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্জ্য অপসারণ করতে দেখা গেছে। কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান জানান, ঈদের দিন দুপুর ২টা থেকে শ্রমিকরা কাজ শুরু করে। তাদের কার্যক্রম তদারকির জন্য রাত সাড়ে ৯ টা পর্যন্ত কর্মকর্তারাও মাঠে ছিলেন। বর্জ্য অপসারণে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ১৬টি টিম মোট ৮৫০ জন শ্রমিক-কর্মচারী, বিভিন্ন সাইজের ৭৬টি ট্রাক, গার্বেজ লোডার, পে-লোডার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। বর্জ্য অপসারণের পর নগরীর ওয়ার্ডগুলোতে ৪ হাজার কেজি ব্লিচিং পাউডার এবং ৪০০ লিটার স্যাভলন ছিটানো হয়েছে। তিনি বলেন, ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনও অনেকে কোরবানী দেন। এজন্য শ্রমিকরা এ দু’দিনও মাঠে ছিল। তারা এ সময় প্রায় ২ হাজার টন কোরবানী পশুর বর্জ্য অপসারণ করেন বলে জানান।


