খুলনায় পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষে রণক্ষেত্র

বহু শিক্ষার্থী আহত ও আটক
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সংঘাত-সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার দুপুর ২টা থেকে নগরীর সাতরাস্তা মোড় থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের ইট-পাটকেল এবং পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটে পুরো এলাকায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পর্যায়ক্রমে সংঘর্ষ রয়েল মোড়, শান্তিধাম, মডার্ন ফার্নিচার মোড়, বাইতিপাড়া, মৌলভিপাড়া, পিটিআই মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত এবং পুলিশের হাতে আটক হয়। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৮ রাউন্ড টিয়ারসেল ও ১২ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় সদর ও সোনাডাঙ্গা থানায় নাশকতার অভিযোগে দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, সংঘর্ষে তাদের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এ সময় আটক করা হয়েছে ৭৫জনকে। খুলনা বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল ও অভিভাবকরা আটক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে নিতে খুলনা সদর থানায় অবস্থান করছিলেন। পরে রাতে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেয় পুলিশ। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে রাত সাড়ে ১১টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত আটককৃত অন্যান্যদের যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বুধবার বেলা ১২টায় রয়েল মোড়ে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’র পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। যদিও বেলা ১১টার পর থেকেই পুলিশ পুরো রয়েল মোড় এলাকায় অবস্থান নেয়। কর্মসূচি অনুযায়ী ১২টার শিক্ষর্থীরা দিকে কেডিএ অ্যাভিনিউ দিয়ে রয়্যাল মোড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কিছু শিক্ষার্থী দৌড়ে আহছান উল্লাহ কলেজের মধ্যে চলে যায়। পরে তারা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী আহত হয়। এ ঘটনায় চারটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
সাতরাস্তা মোড়ে বিক্ষোভকালে বেলা সোয়া দুইটার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, বিজিবি দুই দিক দিয়ে আটকে রাখে। এতে উত্তেজনায় এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিচার্জ ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দুপুর ১টার দিকে হঠাৎ করে আন্দোলনকারীরা ময়লাপোতা মোড়ে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করে। পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং আরেকটি গাড়ি ভাঙচুর করে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এছাড়া ওই এলাকায় টহল দেয় পুলিশের দুটি ভারী যান। পুলিশ ও বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে আন্দোলনকারীরা রয়্যাল মোড়ে বেশিক্ষণ অবস্থান করতে পারেনি। এছাড়া নগরীর শিববাড়ি মোড়েও বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।
এদিকে, দুপুর দেড়টার পরে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী ডালমিল মোড় থেকে লাঠি নিয়ে মিছিল বের করে। পুলিশ আন্দোলনকারী ভেবে তাদের ধাওয়া দিলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে শেরেবাংলা রোড থেকে ছাত্রলীগের আরেকটি মিছিল ময়লা পোতা হয়ে সাত রাস্তার দিকে চলে যায়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ মিছিল নিয়ে রয়েল মোড়ে অবস্থান নেয়।
আন্দোলনকারীরা জানান, সারাদেশে নিহত ছাত্রদের হত্যার বিচারের দাবিতে বুধবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি ছিল। খুলনায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে বেলা ১১টায় রয়েল মোড়ে অবস্থান নগরীর সাতরাস্তা মোড়ে বিক্ষোভকালে বেলা সোয়া দুইটার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, বিজিবি দুই দিক দিয়ে আটকে রাখে। এতে উত্তেজনায় এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিচার্জ ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক জানান, ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ হয়েছে। কোটা আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা মঙ্গলবার রাতে খুলনা সার্কিট হাউসে বৈঠকের পর আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। কিন্তু কিছু সংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল যুবক বিশৃংখলা করার চেষ্টা করছে। সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সর্বশেষ রাতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো.তাজুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৮ রাউন্ড টিয়ারসেল ও ১২ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় সদর ও সোনাডাঙ্গা থানায় নাশকতার অভিযোগে দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া রাতে খুলনা বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষকদের প্রতিনিধি দল ও অভিভাবকদের জিম্মায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আটককৃত অন্যান্যদের যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।






