স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় ৩০ জুলাই সমন্বয়কদের সার্কিট হাউজে ডেকে নিয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়

# জুলাই গণঅভ্যুত্থান #

এম এ আজিম : খুলনায় ৩০ জুলাই সমন্বয়কদের সার্কিট হাউজে ধরে নিয়ে জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সব কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়। খুলনার পলাতক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা এমপি মেয়র ও জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার সহ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের চাপের মুখে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন সমন্বয়করা।
অপরদিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্র হত্যার বিচারসহ ৯ দফা দাবিতে খুলনা নগরীর শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান নেয় খুলনা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা। ৩০ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে তাদের অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। বেলা দেড়টায় কর্মসূচি শেষ করে ফিরে যায় তারা। এ সময় তারা শিক্ষার্থীদের হত্যার বিচার, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ ৯ দফা দাবি জানান। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন। বেলা ১২ টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তাদের ঘিরে রাখে বিপুল সংখ্যক পুলিশ। পরে দুপুর ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ তুলে নেয়।
আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা গুলি দিয়ে আমাদের হত্যা করা হচ্ছে। আন্দোলন গুলি করে শিক্ষার্থীদের মেরেছে পুলিশ। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে যে রক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছে তা নজিরবিহীন। এই নৃশংসতায় সারা পৃথিবীর মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
এর আগে ৩০ জুলাই রাত দশটা থেকে সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত খুলনা সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে তথাকথিত বৈঠকের কথা বলে আন্দোলনের নামে সরকার পতনের কর্মসূচি আখ্যায়িত করে সমন্বয়ক ও অভিভাবকদের গালিগালাজসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়া হয়।
ওই বৈঠক থেকে বের হয়ে তাৎক্ষণিক আওয়ামীলীগ নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনে খুলনা সরকারি আজম খান কমার্স কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ও কোটা আন্দোলন সমন্বয়ক শেখ রাফসান জানি সাংবাদিকদের কাছে ‘খুলনাতে আন্দোলনের সময় আমাদের সাথে পুলিশের সাথে কোনও সংঘর্ষ হয়নি। এজন্য পুলিশ প্রশাসন আমাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আজ থেকে আমাদের আর কোনও কর্মসূচি নেই, আমরা সব আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছি’ মর্মে ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।
একইভাবে বৈঠক শেষে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ গণমাধ্যমকে ‘কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন করেছি। তবে খুলনাতে আমরা কোনও সহিংসতা করিনি। এখন আন্দোলনটা ভিন্ন দিকে চলে যেতে পারে, তা নিয়ে আজ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা হয়েছে। আমরা জানিয়ে দিচ্ছি আমাদের পরবর্তীতে আর কোনও কর্মসূচি নেই’ বলতে বাধ্য হন।
সভা শেষে খুলনা-৩ আসনের তৎকালীন এমপি ও আওয়ামী লীগের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ খুলনার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ডেকে আমরা বললাম, তোমাদের সব দামি মেনে নেওয়া হয়েছে। খুলনায় পুলিশ যদি তোমাদের নামে কোনও মামলা দিয়ে থাকে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। তোমাদেরকে আমি অনুরোধ করব, তোমাদের এই আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে জামায়াত -বিএনপি যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, এটা বন্ধ করতে সহায়তা কর। এই আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন সবগুলো তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা তা মেনে নিয়েছেন।
বৈঠকে খুলনা সিটি মেয়র মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সরদার রকিবুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
সেদিনের তথাকথিত বৈঠকের কথা উল্লেখ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও তৎকালীন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা মহানগরের যুগ্ম সদস্য সচিব মুহিব্বুল্লাহ মুহিব বলেন, খুলনায় ৩০ জুলাইয়ের পূর্ববর্তী সময়ে থ্রেট দিলেও ৩০ জুলাই শিববাড়ি মোড়ে ছাত্রলীগ ও পুলিশ হামলা করে। আমার বন্ধু আহাদকে চড় মারে এবং কয়েকজনকে ধাক্কা দেয়। যাতে তারা চলে যায় – এ রকম একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে তারা। ওইদিন অর্থাৎ ৩০ জুলাই আমাদেরকে পুলিশ ফোন করে সার্কিট হাউসে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে আমরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন ছিলাম। এছাড়া আরও কমার্স কলেজের রাফসান এবং ইমন নামে নর্থ ওয়েস্টার্নের একজনসহ আরও ৫-৬ জন শিক্ষার্থী ছিল। সেখানে আমার সঙ্গে ছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল তানভীর, আয়মান আহাদ, বিপুল শাহরিয়ার, আজিম ইসলাম জিম, সিয়াম ও কাজী ফাহাদুল ইসলাম। আমরা গেলাম সেখানে, যাওয়ার পর দেখি পুলিশের কয়েকটি প্রিজন ভ্যান সার্কিট হাউজের বাইরে রাখা এবং আশেপাশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অবস্থান করছে। তখন আমরা বুঝতে পারলাম পরিবেশ মনে হয় একটু অন্য রকম। তখন ভেতরে গিয়ে দেখলাম আরও অবস্থা খারাপ। ওইদিন সার্কিট হাউসে খুলনার তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন সবাই ছিল। একই সঙ্গে তৎকালীন কেসিসি’র মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, খুলনা-৩ আসনের এমপি এস এম কামাল এবং যুবলীগের শফিকুর রহমান পলাশ ও শেখ শাহজালাল সুজনসহ আওয়ামীলীগ – যুবলীগের অনেক নেতা ছিল। কিন্তু আমরা তো ভাবিনি আওয়ামী লীগ নেতারা থাকবে। আমরা ঢুকার পর আমাদের কথা বলার কোন সুযোগ না দিয়ে তারাই প্রথমে কথা বলা শুরু করল। মানে, তারা এ রকম থিম দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে যে এই আন্দোলনটা জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন, এটা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না, তোমাদের মাথার ওপর কাঁঠাল ভাঙছে-এ রকম নানান কিছু। এমনকি বলে, এটা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত। এসব বলে তারা সেখানে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করলো যে সেখানে আর কথা বলার সুযোগও ছিল না। এমনভাবে তারা আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে এটা হলো সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্র, তোমরা এই ষড়যন্ত্র করতে পার না। ওখানে আর কিছুই বলার ছিল না এমন একটা অবস্থা। তারপরও সেখানে কমার্স কলেজের রাফসান ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই তালুকদার আবদুল খালেক তার কাছে জিজ্ঞাসা করে তুমি কে, এই আন্দোলন সম্পর্কে কি জানো?। এভাবে প্রশ্ন করে আন্ডারএস্টিমেট করার চেষ্টা করে। তখন বলে তোমাদের দাবিতো সরকার মেনে নিয়েছে। তখন রাফসান বলে যে আমাদের দাবিতো ৯ দফা। তারা বলে ৯ দফা কি বলতে পারবা? সে বলে, হ্যাঁ বলতে পারব। তখন ৯ দফার প্রথম দফা ‘শিক্ষার্থীদের রাজাকার বলে গালি দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে হবে’। যখনই সে বলে যে ক্ষমা চাইতে হবে, তখনই তালুকদার আবদুল খালেক এবং এস এম কামাল টেবিলের ওপর থাপ্পড় দিয়ে ইচ্ছামত মা-বাবা ও পরিবার তুলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে এবং বলে তোদের এতবড় সাহস? প্রধানমন্ত্রী তোদের কাছে ক্ষমা চাইবে, কি হইছিস তোরা? কাল আন্দোলনে আসিস শিববাড়ির মোড়ে, তোদের দেখে নেব, দেখি তোদের কতবড় সাহস। এ রকম নানান হুমকি-ধামকি দিতে শুরু করে। এ সময়ে আলোচনা বা কথা বলার আর কোন সুযোগ ছিল না। রাফসানের ওপর তারা যেন আক্রমণ না করে এজন্য আমরা তাকে স্ইেফ করার চেষ্টা করি। তখন তারা বলে যে এখনই ঘোষণা দিয়ে তোমাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করতে হবে। ওই সময়ে কেউ আমাদের পক্ষে ছিল না। এক পর্যায়ে রাত একটার দিকে সেখানে সাংবাদিকদের ডেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করে। ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে আমাদের বের হতে দেয় না। তখন আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ওখান থেকে বের হওয়ার কৌশল হিসেবে কোনমতে খুলনার আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেই। তবে সার্কিট হাউজ থেকে বের হয়ে আসার পথে গাড়িতে বসেই আমি নিজেই ফেসবুক এবং আমাদের গ্রুপে ‘আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা’ প্রত্যাহার করা হলো বলে বিবৃতি দিই। সেখান থেকে আমরা ফিরে এসে সবাই প্রচুর কান্নাকাটি করতে থাকি। যে, আমরা তো কোন অযৌক্তিক কিছু করিনি, একটি যৌক্তিক আন্দোলন করছি। তখনতো অনেক লাশ পড়ে গেছে। ভাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করায় আমাদের কান্না আসছিল।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও সদ্য স্থগিত হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা মহানগরের মুখপাত্র মো. আহাদ হোসেন (আয়মান আহাদ) বলেন, প্রথমেই সহিংস রূপটা খুলনায় প্রথম শুরু হয় ৩০ জুলাই। আমরা ক্যাম্পাস থেকে কয়েকজন শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান করি। তখন ডিবির ডিসি নুরুজ্জামান এসে বলে আমাদের এখানে মিছিল করতে দেবে না। তখন আমি এবং অন্যান্য কলেজের কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থী সামনে এগিয়ে গেলে ওদের গায়ে হাত তোলে। আমার পাশে হেলাল ভাই ছিল উনার গায়েও হাত তোলে। পরে শাহরিয়ার ভাইও আসে। তখন আমি এগিয়ে গেলে তিনি কলার ধরে আমাকে ধাক্কা দেন। ৩০ জুলাই আমরা শিববাড়িতে আন্দোলন করলাম। তখন পুলিশ এবং অন্য এক নিরাপত্তা বাহিনী দপ্তর থেকে ফোন আসে এবং ওইদিন সার্কিট হাউজে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ নির্যাতনের হুমকি দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুলনার উপদেষ্টা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিনহাজুল আবেদিন সম্পদ বলেন, আওয়ামী লীগের গঠিত পুলিশ প্রশাসন খুলনায় ছাত্র প্রতিনিধিদের ডেকে নিয়ে চাপ প্রয়োগ করে তাদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক অবস্থান নেওয়ায়। আন্দোলনকে স্থগিত করার নোটিশ দেয়। খুলনার সকল ছাত্র সমাজ ও আপামর জনতা যখন স্বাধীনতার জন্য ছাত্র সমাজের দিকে তাকিয়ে আছে তখন আন্দোলন স্থগিত করার নোটিশ খুলনাবাসীকে হতাশ করে। কিন্তু আমরা ৩১ জুলাই আন্দোলনকে আবার ফিরিয়ে আনি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button